অমর একুশে

10

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৫২ থেকে ২০১৮; দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা এখন বিশ্বময়। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাংলা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাও। তাই ফেব্রুয়ারি এলেই দেশে দেশে পরম গর্বে শ্রদ্ধায় স্মরণ হয় বাংলা ভাষা। ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধায়-শোকে নত হয়ে আসে বিশ্বের মানুষের মাথা।
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে আমি ফাঁসির দাবি করছি।ভাষার জন্য এমন প্রতিবাদের ও প্রতিশোধের দীপ্ত উচ্চারণ নিয়ে আবারও এলো ফেব্রুয়ারি। বাঙালির অহংকারের মাস। ভাষার মাস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা মিছিল বের করলে সে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, রফিক, বরকতদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এ খবরে সারা দেশে ওঠা প্রতিবাদের ঝড়ে শামিল হন কবিরাও। সেদিনই চট্টগ্রাম থেকে প্রতিবাদে শোকে ক্ষুব্ধ ভাষাসৈনিক ও কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী লেখেন একুশের প্রথম কবিতা কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। সেই থেকে ভাষা শহিদদের প্রতিটি রক্তকণা হয়ে বাঙালির বুকে আগুন হয়ে জ্বলছে কবিতাটি। বায়ান্নর এ মাসেই ভাষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউরসহ নাম না জানা সোনার ছেলেরা। রক্তের সিঁড়ি বেয়ে রচিত হয়েছিল ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জনের এক অমোঘ ইতিহাস। বাংলা ভাষা পেয়েছিল বাঙালির মাতৃভাষার মর্যাদা। সে পথ ধরেই এসেছিল গণঅভ্যুত্থান, স্বাধিকার আন্দোলন ও সর্বশেষ প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা।বাঙালির চৌহদ্দী পেরিয়ে ফেব্রুয়ারি এক দিন পৌঁছায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বাংলাভাষী মানুষের নিজ ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা, বিশ্বের সব জাতিগোষ্ঠীকে এনে দেয় নিজ মুখের ভাষায় কথা বলার অধিকার। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ফেব্রুয়ারি। বাংলা বর্ণে বাঙালির স্বপ্ন বুননের মাস। বুকে নিয়ে স্বর্ণখচিত বর্ণ, উড়বার মাস মেঘমুক্ত আকাশে। সাদা-কালোয়, শোকে-আনন্দে, চিৎকার করে কথা বলার মাস-প্রাণের ভাষায়, মায়ের ভাষায়। কেননা ভাষার জন্য এমন রক্তক্ষরণ, প্রাণের এমন অর্ঘ্য কে, কবে, কোথায় দিয়েছে বিশ্বে!সাতচল্লিশের দেশ ভাগ থেকেই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের। ঘোষণাও এসেছিল বারবার। কিন্তু মেনে নেননি বাংলার দামাল ছেলেরা। বরং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে নেমেছিল পথে। উত্তাল করে তুলেছিল গোটা দেশ-রাজপথ। উর্দুর দাবিকে অগ্রাহ্য করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীব্র সে;াগানে কেঁপে উঠেছিল আকাশ-বাতাস। প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল ভাষার মর্যাদা।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে ভারতবর্ষ এবং পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে ভাষা সমস্যা। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দারাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু সম্মেলনে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু। তার সঙ্গে সুর মেলান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন।
তখনো ভাগ হয়নি দেশ। প্রতিবাদ করেন বরেণ্য বাঙালি ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। ৪৭-এ পাকিস্তান আসে। মনিঅর্ডার ফর্ম, পোস্ট কার্ড, খাম ও কাগজের মুদ্রা থেকে বাদ যায় বাংলা। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে বাঙালি। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনের প্রথম সূত্রপাত করে তমদ্দুন মজলিস।
উত্তাল পথ পেরিয়ে একদিন আসে আগুনঝরা ৫২। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে বাংলার দামাল ছেলেরা মিছিল করলে গুলি চালায় পুলিশ। শহিদ হন সালাম, রফিক, বরকত ও জব্বার। অবশেষে ৫৪ সালের ৯ মে গণপরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলা। সেই থেকে বাংলা হয়ে ওঠে বাঙালির গর্বের ভাষা।ভাষা শহীদের স্মরণ করতে গোটা দেশ সেজেছে নানা সাজে, উৎসবে, শোকগাথায়। রাজধানীতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজন করেছে মাসব্যাপী অনুষ্ঠানমালার। জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করেছে জাতীয় কবিতা উৎসবের।মুখে নিয়ে প্রাণের বর্ণমালা, গল্পে উচ্চারণে গানে, ফেব্রুয়ারি আলোকিত হয়ে উঠবে স্বমহিমায়, গৌরবে, আনন্দে। চলনে বলনে বাঙালি নতুন করে শপথ নেবে ভাষার মর্যাদা রক্ষায়, শুদ্ধ করে বাংলা উচ্চারণের। চারদিক ধ্বনিত হবে সেই কালজয়ী গান- আমার ভাইয়ের রক্তের রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।

  •