৭ দেশের ১২৬ হাওর ঘুরে টাঙ্গুয়ায় ফিরল ‘কিশোয়া’

10

সবুজ সিলেট ডেস্ক
শীত এলেই বাংলাদেশের হাওর, জলাভ‚মি ও নদীচরে চোখে পড়ে অচেনা পাখি। স্থানীয় মানুষ ‘অতিথি পাখি’ নামেই ডাকে এদের। যদিও ‘অতিথি পাখি’ টার্মটিই ভুল! এরা মূলত পরিযায়ী অর্থাৎ যাযাবর পাখি। এক দেশে থেকে আরেক দেশে ঘুরে। প্রজননকালে ছুটে যায় শীতপ্রধান অঞ্চলে। বলা হয়ে থাকে-পূর্ব ইউরোপ, সাইবেরিয়া এবং হিমালয়াঞ্চলে ওদের ঘর!
পরিযায়ী পাখিদের রয়েছে চমকপ্রদ কিছু অভ্যাস। যার মধ্যে অন্যতম হলো-প্রথম বছর এসে এরা যে হাওর, নদীচর কিংবা জলাভ‚মিতে আশ্রয় নেয়, পরের বছর ঘুরে-ফিরে ঠিক সেখানেই ফিরে আসে। মজার বিষয় হলো- সেটি আগের বছরের মাস বা দিন হিসেবেও খুবই কাছাকাছি সময়ে। অকল্পনীয় সূক্ষ্ম মস্তিুষ্কের কারণে পরিযায়ী পাখিদের পক্ষে এটি সম্ভব হয়।
সাতটি দেশ ঘুরে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ফিরে এসে তেমনটি প্রমাণ করেছে একটি ‘গিরিয়া-হাঁস’। গবেষকরা এটির পিঠে ট্রান্সমিটার লাগানোর সময় নাম দিয়েছিল ‘কিশোয়া’। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সীমান্তদীপু এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের ৫ ফেব্রæয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরে আমরা এটির পিঠে জিপিএস ট্রান্সমিটার লাগিয়েছিলাম। ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘কিশোয়া’ ফের টাঙ্গুয়া হাওরে ফিরে আসে। মাঝে একবছরে এটি পাড়ি দিয়েছে ৫২০০ কিলোমিটার পথ। পরিযান করেছে বাংলাদেশ ছাড়াও সাতটি দেশ। বর্তমানে বুনোহাঁসটি টাঙ্গুয়ার হাওরে অবস্থান করছে।’
‘কিশোয়া’ নামের গিরিয়া-হাঁসটির সবচেয়ে দূরের গন্তব্য ছিল মঙ্গোলিয়া। সেখানে এটির প্রজননভ‚মি। ২০১৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত-নেপালের হিমালয়াঞ্চল এবং চীন রুট পাড়ি দিয়ে এপ্রিলের শেষ দিকে এটি শীতপ্রধান অঞ্চলে পৌঁছে বলে জানায় আইইউসিএন সূত্র।
পাখি গবেষক সীমান্তদীপু আরও বলেন, ‘আমরা জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর এটি বাংলাদেশের শতাধিক বিলজাতীয় জলাভ‚মিতে অবস্থান করে। তারপর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত, নেপাল, হিমালয়াঞ্চল এবং চীনের কয়েকটি হাওরে অবস্থান করে। সেখান থেকে সরাসরি মঙ্গোলিয়া প্রজননভ‚মিতে পাড়ি দেয়।’
গেল কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশে আসা পরিযায়ী পাখিদের গায়ে জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে আইইউসিএন। বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত৫২টি পরিযায়ী পাখির শরীরে জিপিএস ট্রান্সমিটার বসানো হয়েছে। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে আরেকটি ‘গিরিয়া-হাঁস’-এর গায়ে ট্র্যাকার বসানো হয় বলে জানান আইইউসিএন’র আরেক গবেষক অনু তারেক। তিনিও এখন টাঙ্গুয়ার হাওরে অবস্থান করছেন।
অনু তারেক বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ট্রান্সমিটার বসিয়ে ছেড়ে দেওয়া সকল পাখি এখনো পর্যন্তসুস্থ রয়েছে। ট্র্যাকারের মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত এদের চমৎকার তথ্য পাচ্ছি। এদের আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিসহ অনেক তথ্য মিলেছে। গবেষণা কাজে এসব তথ্য অমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজে দেবে।’
পরিযায়ী পাখিদের এমন অভ্যাস বিষয়ে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী গবেষক সারোয়ার আলম বলেন, ‘ট্র্যাকারের মাধ্যমে পাওয়া ম্যাসেজটি অত্যন্তমূল্যবান। পরিযায়ী পাখিরা যেখানে আসে, পরের বছরও প্রথমে সেখানেই আসবে। যদি আগের মতো অনুকূল পরিবেশ আর না পায়, সেক্ষেত্রে এরা দিকভ্রান্তহয়ে পড়ে। খুব বেশি দূরে খাদ্যের সংগ্রহে আর যেতে পারে না। ফলে খাদ্যাভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় কিংবা দলছুট হয়ে আর ঘরে ফিরতে পারে না।’
পরিযায়ী পাখিদের আগমন ও বিচরণস্থল সংরক্ষণ করার তাগিদ দিয়ে এই গবেষক বলেন, ‘পাখিদের এমন অভ্যাসের বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সবাইকে অনুধাবন করাতে হবে যে- যদি কোনো হাওর বা জলাভ‚মি আমরা হঠাৎ নষ্ট করে ফেলি, তবে পরের বছর পাখিগুলো এসে মারা পড়বে। বিপন্ন হবে আমাদের পরিবেশ।’
গিরিয়া হাঁসের ইংরেজি নাম এধৎমধহব। দেখতে ছোট আকারের। পুরুষ হাঁসের মাথা ও বুক বাদামী বর্ণের। চোখের উপর সাদা সীমানাযুক্ত দাগ দেখতে পাওয়া যায়। এদের ঠোঁট, পালক ও পা দেখতে খয়েরি রঙের। তবে ডানার নিচের অংশ সাদা সীমানাযুক্ত হালকা নীল। মাথার উপরের অংশ গাঢ় বর্ণের। মুখ লালচে বাদামি।
স্ত্রী হাঁসটি দেখতে অনেকটা পাতি তিলিহাঁসের মতো। স্ত্রী হাঁসের বিশেষত্ব হলো- মুখের আকার। পুরুষ হাঁস ভিন্নতা হলো- এরা পানিতে ডুব দিয়ে বারবার মাথা ঝাঁকায় এবং ঠোঁট একটু লম্বা। চোখের ভ্রু ফ্যাকাসে। গিরিয়া হাঁস ভ‚চর স্বভাবের। লোনাপানি ও মিঠাপানি উভয়ে এদের দেখা মেলে।
এদের প্রিয় খাবার ছোট মাছ, জলজ পোকামাকড় ও উদ্ভিদের বীজ, মূল, কান্ড, পাতা। মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুলাই প্রজনন সময়কাল। ভাসমান জলজ উদ্ভিদে আচ্ছন্ন জলাভ‚মিতে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। আইইউসিএন তালিকায় ‘গিরিয়া-হাঁস’ আশঙ্কাহীন প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এই পাখি শিকার দন্ডনীয় অপরাধ।

  •