রক্তাক্ত মার্চ বছর ঘুরে এলো অগ্নিঝরা মার্চ

7

স্টাফ রিপোর্টার
বাংলার প্রান্তরে আবার এসেছে ফিরে অগ্নিঝরা উত্তাল দিন। আজ পয়লা মার্চ। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের দিন। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের এদিনে বাঙালি জাতি জেগে উঠেছিল তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। মেতে উঠেছিল নিজেদের স্বাধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রামে। স্বাধীনতা অর্জনের হুশিয়ারি হুঙ্কার দিয়েছিল স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি স্বৈরাচার শাসক শত্রম্নদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করেনি বীর বাঙালি। অকুতোভয়ে বাঙালিরা আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগুচ্ছিল বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয়ে। এ মাসে এ ভূখন্ড হয়ে ওঠে আন্দোলনমুখর, জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছিল সোমবার। এ দিনই জাতীয় পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত অধিবেশন বাতিলের আকস্মিক ঘোষণা আসে। আর ইয়াহিয়া খানের এ ধরনের ঘোষণায় ফুঁসে ওঠে সমগ্র জাতি। তবে এ আন্দোলন আকস্মিক নয়। মুক্তিযুদ্ধ অনেক আগে থেকেই বাঙালির মনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। আর মার্চে সে ক্ষোভ রূপ নেয় স্বাধীনতাযুদ্ধে।
এর চার মাস আগে অর্থাৎ ১৯৭০ সালে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পরিষদের নির্বাচন। সে নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগের এ বড় জয়ে সমগ্র বাঙালি জাতি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই জাতীয়
পরিষদের অধিবেশন বাতিল করেন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। পূর্বনির্ধারিত ৩ মার্চের এ অধিবেশন শুরুর মাত্র দু’দিন আগে নেয়া পাকি শাসকের এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্তে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলার জনপদ।
একাত্তরের ১ মার্চে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খানকে কিছু শর্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো শর্ত মানতে রাজি হননি। ফলে সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খান বঙ্গবন্ধুকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তানে কামান দাগানো হবে’ (গর্জে উঠবে)। ওই হুমকি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু টেবিল চাপড়ে গর্জে বলে উঠেন- ‘আপনি আমাকে কিছু করলেও সহ্য হবে, কিন্তু বাংলা এবং বাঙালিদের ওপর কামান দাগানো হলে তার বদলা নেব। কোনো কথা না বলে সাহেব জাদা ইয়াকুব আলী খান সোজা চলে যায় পাকিস্তানে।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই পাকিস্তানি জেনারেল ইয়া হিয়া খানের সঙ্গে বাঙালিদের ওপর শাসনভার ছেড়ে দেয়ার বিষয়াদি নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টসহ রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভট্টোর মধ্যকার বিভিন্ন আলোচনা চলছিল। দিনের পর দিন চলছিল ওই আলোচনা। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হচ্ছিল না।
সেই সময় বিবিসি’র সাংবাদিক মার্ক টালি বলেছিলেন ‘মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যকার আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে না। কারণ আলোচনা চলছে দুই বন্দির মধ্যে সবে মাত্র। একজন ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি, অপরজন শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিকামী বাঙালি জনগণের হাতে বন্দি।’ অপরদিকে, এ সব নামমাত্র পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র আলোচনা থেকে বাঙালিদের পক্ষে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত হচ্ছিল না। তবে মুক্তিকামী বাঙালি জনতারা অতি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রমূলক আলোচনা থেকে কোনো সুফল আসবে না।
তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ডাক দেন স্বাধীনতার পক্ষে অসহযোগ আন্দোলনের। শুধু অসহযোগ নয়, বঙ্গবন্ধু’র ডাকে স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একাত্তরের এদিন বিদ্রোহে ফেটে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক, কলকারখানার শ্রমিক এবং আদালতের আইনজীবীগণসহ সর্বস্তরের মুক্তিকামী আপামর জনতা।
এ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় হোটেল পূর্বাণীতে এক সংবাদ সম্মেলন ডাকেন এবং বৈঠক করেন। সংক্ষিপ্ত হস্তান্তর বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় হরতাল এবং ৩ মার্চ বুধবার দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালনের আহ্বান জানান। পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণাকল্পে ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।
মূলত ইয়াহিয়ার জাতীয় পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত অধিবেশন বাতিলের আকস্মিক ঘোষণার ফলে সারা দেশে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রপাত। একপর্যায়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। এ দিনেই স্বাধীনতাকামী বিক্ষুব্ধ মানুষের মুখে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ আগের চেয়ে অনেক দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়।
শোষকগোষ্ঠীর বিষ দাঁত ভেঙ্গে দিতে বাঙালি জাতি বেছে নেয় সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ মার্চ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস অবিরাম যুদ্ধের পর ওঠে স্বাধীনতার সূর্য। পৃথিমানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। বাংলার আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা পায় লাল-সবুজের পতাকা।

  •