সিলেটে বিলুপ্তির পথে সিনেমা হল

18

স্টাফ রিপোর্টার
বিলুপ্তির পথে সিলেটের সিনেমা। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে দলবেঁধে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সিনেমা দেখার দিন আর নেই। আগ্রহ নেই বিভিন্ন শ্রেণি পেশার শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষেরও। সিনেমার কাহিনী নিয়ে চলা আড্ডাও আর দেখা যায় না। সিনেমা হলগুলোর সেই জমজমাট অবস্থা এখন কেবলই স্মৃতি।
টিভি সিরিয়ালের ভিড়ে সিনেমা হলে নেমে এসেছে দুর্দিন। সারা দেশের মতো সিলেটের নামকরা ৭টি সিনেমা হলের মধ্যে ৫টি বন্ধ হয়ে গেছে দীর্ঘদিন আগে। দুইটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, যেকোনো সময় সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিনেমা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সিলেট নগরীর ৭টি সিনেমার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া সিনেমাগুলো ভেঙে কোনটিতে মার্কেট আবার কোনটি ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে।
সিলেট নগরীর প্রথম সিনেমা হল জেলগেট গলির মুখের রংমহল ও লালকুটি এখন শুধু কালের সাক্ষী। সিলেটের প্রথম সিনেমা হল হচ্ছে এই দুটি। রংমহল সিনেমা হল ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতলা মার্কেট। বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাগুলো হচ্ছে-কদমতলী এলাকার কাকলী, তালতলার দিলশাদ, বাগবাড়ীর মনিকা, লালবাজারের লালকুটি ও জেলগেট গলির মুখের রংমহল। খুঁড়িয়ে চলছে তালতলার নন্দিতা ও আখালিয়ার বিজিবি সিনেমা হলও। সাত বছর পর বিজিবি সিনেমা হলে ছবি দেখতে আসা সুনামগঞ্জের লুকমান আহমদ বলেন, একসময় প্রতি শুক্রবারে ছবি দেখতাম। সিনেমা হলগুলোতে ভাল কোন ছবি না আসায় দর্শকও নেই। যারা আসছে ছবি দেখার জন্য নয়, শখে হলমুখী হচ্ছেন। এখন মোবাইল ফোনই সিনেমা হল। একসময় বিভিন্ন উপজেলার শিল্প-প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটির দিনে সিনেমা হলে ভিড় জমাতেন। টিকিট পেতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো।
নন্দিতা সিনেমা হলে ‘বীর’ নামে একটি বাংলা ছবি চলছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় দেখা যায় টিকিট কেনার জন্য নেই কোন দর্শক। দুইজন টিকিট বিক্রেতা গল্প গুজব করে সময় পার করছেন।
নন্দিতা সিনেমা হলের টিকিট বিক্রেতা হোসেন আহমদ বলেন, ২০ বছর থেকে এই পেশায় আছি। একসময় সিনেমা হলে ছবি দেখার জন্য দীর্ঘ লাইন ও টিকিট নিয়ে কাড়াকাড়ি হতো। আজ সেই দিনগুলো স্মৃতির পাতা। এখন টিকিট বিক্রি করে কোনরকম পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন দর্শকও হন না। দর্শকদের আগের মত আগ্রহও নেই। দেশে ভাল কোন ছবিও হচ্ছে না। ১৪/১৫ বছর আগে আমাদের সিনেমা হলে টিকিট বিক্রেতাসহ ৫৫ থেকে ৬০ জন কর্মচারী ছিলেন। এখন ৭-৮ জন দিয়ে চলে।
সিলেটের বিভিন্ন সিনেমা হল মালিকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ডিশলাইন, ইউটিউব, টুইটার, ইন্টারনেটের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেখা, ভারতীয় সিরিয়ালের প্রতি ঝোঁক আর ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশনের কারণে বড় পর্দায় ছবি দেখতে অনেকেই আগ্রহী নন। এতে লোকসানের মুখে পড়ে সিনেমা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
রিকশা চালক নুরুল ইসলাম জানান, এসব হলে এক সময় সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ স্বপরিবারে সিনেমা দেখতেন। ভাল কোন ছবি না আসায় ও অশ্লীলতার কারণে সিনেমা হলের দুর্দিন চলছে।
নন্দিতা সিনেমা হলের ম্যানেজার মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আমাদের সিনেমা চালু হওয়ার ৩৫ বছরের মত হবে। আর আমি এই সিনেমার জন্মলগ্ন থেকে আছি। এক সময় এই সিনেমা হল দিয়ে ব্যবসা করে অনেক টাকা ইনকাম করা গেছে। দর্শকরা ঘন্টার পর ঘন্টা টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। টিকেট শেষ হয়ে গেলে দর্শকরা বাড়তি টাকা দিয়ে ছবি দেখার জন্য ঢুকতেন। আর এখন শখের বশে কেউ ছবি দেখতে আসে। এসব ইনকাম দিয়ে কর্মচারীদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিলও ঠিকমত দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, শুধু আমাদের সিলেট নয় অভিজ্ঞ কোন শিল্পী না থাকায় সারাদেশে ১২শ সিনেমার মধ্যে এখন আছে ১১০টার মত। দেশে উন্নত কারিগরি ও দক্ষ অভিনেতার অভাব রয়েছে।

  •