অগ্নিঝরা মার্চ

10

স্টাফ রিপোর্টার
অগ্নিঝরা মার্চের পঞ্চম দিন আজ। মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণার আগে ৪ মার্চ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে হরতালের সমর্থনে বের হওয়া মিছিলে গুলি চালায় পাক বাহিনী। এ ঘটনার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৫ মার্চ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হয়।
১৯৭১ সালের এদিনে পূর্ণ দিবস হরতাল পালনের সময় পুলিশ পুনরায় গুলি চালায়। টঙ্গী শিল্প এলাকায় পুলিশের গুলিতে ৪ শ্রমিক নিহত ও ২৫ শ্রমিক আহত হন। এ খবর দ্রম্নত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে টঙ্গীর হাজার হাজার শ্রমিক। তারা টঙ্গী ব্রিজে আগুন ধরিয়ে রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। এভাবেই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। দেশের সর্বস্তরের মুক্তিকামী জনতা পাকিস্তান সরকারের এ ধরনের বর্বরতার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে।
দিনব্যাপী হরতাল পালনে সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল বের হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বেলা আড়াইটা থেকে ৪টা পর্যন্ত ব্যাংকগুলো খোলা রাখা হয়। পাশাপাশি রেশন দোকানগুলো এ সময় খোলা রাখা হয়। উত্তাল মার্চের ঐতিহাসিক এইদিনে জাতীয়
পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণাকে বেলুচিস্তান ন্যাপ অবাঞ্ছিত ও অগণতান্ত্রিক ঘোষণা করে।
আজকের দিনেই সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়, তাও বঙ্গবন্ধুর আহŸানে। চট্টগ্রামে ২ দিনের সংঘর্ষে এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহতের সংখ্যা ২২২ বলে দাবি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বিবৃতি দেন। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে শান্তিপূূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহŸান জানান। উত্তাল বিক্ষোভে এদিন রাজশাহী এবং রংপুরেও গুলির ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর সেনাবাহিনীর গুলির প্রতিবাদে ডাকসুর নেতৃত্বে বের হয় ঢাকায় বিশাল লাঠি মিছিল। ডাকসুর ভিপি আসম আবদুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখনের নেতৃত্বে মিছিলে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, ছাত্র-জনতা যোগ দেয়। পূর্ব বাংলার লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরাও শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদ এবং হত্যার নিন্দা জানান। সভায় সভাপতিত্ব করেন ড. আহমদ শরীফ। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি শামসুর রাহমান, সাংবাদিক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শিল্পী মহিউদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। তারা পূর্ব বাংলার স্বাধিকারের জন্য সবাইকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়ার আহŸান জানান। মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষ এর সমুচিত জবাব দেবে। একই ধরনের বিবৃতি দেন ন্যাপের মোজাফফর আহমেদ ও সৈয়দ আলতাফ হোসেন। এ দিনেই জুলফিকার আলী ভুট্টো তার দলের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। এর আগে ভুট্টো তার দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দু’দিনের অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, দেশের অখন্ডতা ও সংহতির স্বার্থে তার দল আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচির মধ্যে কোনটা তিনি গ্রহণ করবেন। তবে তিনি জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহŸানের জন্য দাবি জানাবেন কিনা বা স্থগিতের ঘোষণার প্রতিবাদ করবেন কিনা এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনীর নির্বিচারে হত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেন, পরবর্তী যে কোনো পরিস্থিতির জন্য সেনাবাহিনীকেই দায়ী থাকতে হবে। তিনি আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের প্রতিও আহŸান জানান। তাছাড়া দেশের এ জরুরি পরিস্থিতিতে যে কোনো খবর আওয়ামী লীগ অফিসে এসে পৌঁছে দেয়ার জন্যও জনগণের প্রতি আহŸান জানানো হয়।
এছাড়া সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশের সংহতি রক্ষা করা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান। মাওলানা গোলাম গাউস হাজারি জানিয়ে দেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সব নির্বাচিত সদস্যের পক্ষ থেকে ভুট্টোর কথা বলার অধিকার নেই। মানিক গোলাম জিলানী বলেন, অবিলম্বে সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এসব নেতার কারো বক্তব্যই গুরুত্ব দেয়নি।
একদিকে ঢাকাসহ দেশজুড়ে চলছিল প্রচন্ড বিক্ষোভ। ঘরে ঘরে চলছিল প্রস্তুতি। গঠন করা হয়েছিল প্রতিটি এলাকায় সংগ্রাম কমিটি। চলছিল অস্ত্র সংগ্রহ এবং ট্রেনিং। অপরদিকে সান্ধ্য আইন জারি করে, মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সেনা শাসকরা বাঙালির সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দিতে পরিকল্পনা নেয়। এমন যখন অবস্থা তখন সবকিছুই নির্ভর করছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ওপর। কারণ তার অঙ্গুলি হেলনেই তখন সমগ্র দেশবাসী পরিচালিত হচ্ছিল। পাকিস্তানের প্রশাসন বলতে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। শেখ মুজিব যা বলতেন তা-ই তখন আইন। আর তা-ই মানত সবাই। ‘এক নেতা এক দেশ- বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’-এ ¯েøাগানই দেশের সর্বস্তরের প্রাণের স্স্নোগানে পরিণত হয়।

  •