অগ্নিঝরা মার্চ

6

স্টাফ রিপোর্টার
অগ্নিঝরা ৯ মার্চ আজ। সর্বাত্মক অসহযোগে স্থবির হয়ে পড়ে তৎকালীন পাক প্রশাসন। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর হিসেবে লে. জেনারেল টিক্কা খানের শপথ গ্রহণের কথা থাকলে তা-ও বাতিল হয়ে যায়।
স্বাধিকার আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী বন্ধ থাকে সচিবালয়সহ সারাদেশে সব সরকারি ও আধাসরকারি অফিস, হাইকোর্ট ও জেলা কোর্ট। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্টের বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী টিক্কা খানকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে এ জন্য নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হয় পাক সরকার।
তবে বঙ্গবন্ধু যেসব সরকারি অফিস খোলা রাখার নির্দেশ দেন, কেবল সেগুলোই খোলা থাকে। জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য ট্রেন, লঞ্চ, বাস, ট্যাক্সি ও অন্যান্য যানবাহন চালু থাকে। খোলা থাকে দোকানপাট ও হাটবাজার। সারাদেশে ব্যাংকিং কাজকর্মও চলে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে বন্ধ থাকে বিমান চলাচল।
পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বত্র তীব্র প্রতিরোধ, আক্রমণ আর সব ক্ষেত্রে অসহযোগ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আস্তে আস্তে বাংলার মানুষের মন থেকে মুছে যেতে শুরু করে। সবকিছুর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাকিস্তান সরকারের সামরিক প্রশাসন বাঙালিদের দমন করার জন্য জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যার পথ বেছে নেয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করতে থাকে আন্দোলনরত ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষকে। প্রতিশোধ আর প্রতিরোধস্পৃহায় ফুঁসে ওঠে সারাদেশ। দেশের বহু স্থানেই শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র সংগ্রাম। পথে পথে ব্যারিকেড আর মিছিলে গোটা দেশই অচল হয়ে পড়ে। দেশের প্রতিটি কর্মকান্ড চলতে থাকে বাংলার গণমানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদেশ-নির্দেশে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের প্রতিরোধযুদ্ধ, বিক্ষোভ আর আন্দোলনের তীব্রতা লক্ষ্য করে ঢাকায় অবস্থানরত জাতিসংঘ মিশনসহ দেশের বিভিন্ন শহরে অবস্থানকারী বিদেশিরাও পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে শুরু করে।
মার্চের এই দিনই বাঙালির আরেক অবিসংবাদিত নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাপের বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। পল্টন ময়দানের এ সমাবেশে তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ২৫ মার্চের মধ্যে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা দানের আলটিমেটাম দেন। নতুবা তিনিও শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে এক হয়ে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করবেন বলে হুশিয়ার করেন।
সভায় বাংলা লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে বলেন, আপনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। আপনি স্বাধীন বাংলার জাতীয় সরকার ঘোষণা করুণ।
একাত্তরের এইদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় গৃহীত স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। একইদিনে বন্ধ ঘোষণা করা হয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে আন্দোলনের নতুন ১৬টি নির্দেশ জারি করেন।
ওদিকে ইসলামাবাদে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসবেন।’ সামরিক কর্তৃপক্ষ রাজশাহী শহরে প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে আট ঘণ্টার কারফিউ জারি করে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কারফিউ জারির প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে ঘোষণার পর রাজশাহীতে হঠাৎ সান্ধ্য আইন জারির কারণ বোধগম্য নয়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হলো, সরকার এখনও সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়নি।
পূর্ব-পাকিস্তানের এই উত্তাল সংগ্রামমুখর পরিস্থিতি বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট প্রয়োজনে ঢাকা থেকে জাতিসংঘের স্টাফ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য ঢাকার জাতিসংঘ উপ-আবাসিক প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেন। জাপানের পররাষ্ট্র দপ্তরও ঢাকায় অবস্থিত তাদের নাগরিকদের প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিম জার্মানি সরকার তার দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য সামরিক বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

  •