গণফোরামে ভাঙন: জোটগত রাজনীতির বিকল্প চিন্তা বিএনপিতে

9

সবুজ সিলেট ডেস্ক
দলীয় ও জোটগত ভুলত্রুটি নিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচবার টেবিল আলোচনা সেরেছে বিএনপি। গত দুই মাসে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নিজেদের অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছেন নিবিড়ভাবে। দলের নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে-জোটগত রাজনীতির ফসল কার ঘরে গেছে? আর এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হতেই নতুন চিন্তা জড়ো করলো গণফোরাম।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ও রাতে কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দলটি কার্যত দুটো ভাগ হয়ে যায়। একটিতে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে আছেন তার অক্সফোর্ডকালীন সহকারী ড. রেজা কিবরিয়া। দ্বিতীয় গ্রæপটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই জন সাবেক নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু। নিজেদের সংগঠনে ভাঙন সৃষ্টি হলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত থাকার ইচ্ছা উভয়পক্ষের। গণফোরামের বিভক্তি নিয়ে ব্যথিত হলেও বিএনপিতে শুরু হয়েছে জোটগত রাজনীতির ভবিষ্যৎ চিন্তা।
গত দেড় সপ্তাহে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে। একইসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের নতুন পরিসরে জোটগত রাজনীতির নতুন সম্ভাবনার কথা জানালেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।
ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নিশ্চিত করেই বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টে সুব্রত-মন্টু অংশ এলে তাদের অংশ ফ্রন্ট ত্যাগ করবে। আবার মন্টু-সুব্রত অংশের নেতারা বলছেন, তারা সানন্দেই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে?
জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শুক্রবার বলেন, ‘বিষয়টি নিঃসন্দেহে গণফোরামের দলীয় ব্যাপার, তবে এ ধরনের বিভক্তি আমাদের কাম্য নয়। এই মুহূর্তে যখন জাতি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সেই সময় একটি গণতান্ত্রিক দলে বিভক্তি কাম্য হতে পারে না। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি পরিস্থিতি।’
মির্জা ফখরুল যেভাবেই বলুন না কেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে গণফোরামের অন্যতম শীর্ষ এক নেতা এ প্রতিবেদককে জানান, পরিস্থিতি তিনি হ্যান্ডেল করবেন এবং তার পূর্ণ মনোযোগ সংগঠন গড়ে তোলার দিকে।’
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়ার মন্তব্য, ‘যারা ড. কামাল হোসেনকে সম্মান করতে ভুলে যান, তারা কীভাবে গণফোরামের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকবেন।’ তিনি বলেন, ‘নতুন দল করে কামাল হোসেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চান কারা, এটা নিশ্চয়ই দেশের মানুষ বিবেচনা করবেন।’
গত বৃহস্পতিবার বিকালে মোবাইলে গণফোরামের আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ পড়া সাংগঠনিক সম্পাদক লতিফুর বারী হামীম কাছে অভিযোগ করেন, গণফোরাম প্রতিষ্ঠার সময় কামাল হোসেন বলেছিলেন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালনার কথা। আজকে কামাল হোসেন সেই অবস্থানে নেই, তিনি ভ্রান্তপথে পরিচালিত হচ্ছেন।
নতুন আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তিনি বলেন, ‘গণফোরামের এই সমস্যা ঐক্যফ্রন্টে প্রভাব ফেলবেই। কারণ, যেখানে আমরা ১১১ জনের কমিটিতে গণতন্ত্র রাখতে পারি না, সেখানে দেশের গণতন্ত্র কীভাবে রক্ষা করব। কামাল হোসেন আমাদের সঙ্গে একভাবে কথা বলেন, আবার কিবরিয়ার সঙ্গে অন্যভাবে কথা বলেন।’
ঐক্যফ্রন্টের জোটগত রাজনীতিতে গণফোরামের এই ভাঙন কেমন প্রভাব ফেলবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে রেজা কিবরিয়া আগেই জানান, ঐক্য ভাঙার কোনও কারণ নেই।
তিনি বলেন, ‘স্যার (কামাল হোসেন) সবসময় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ, এটা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বেগম জিয়ার বিষয়ে খুবই আন্তরিক। আমি নিজেও বিভিন্ন সভায় নিয়মিতই তার প্রসঙ্গে বলি, ডা. জাফরুল্লাহ ভাইয়ের উদ্ধৃতি দিয়েই বলি, পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান কারাগারে থাকা বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসা নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। আমরা নির্বাচনমুখী দল, সংগঠন গুছিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবো।’
গণফোরামের ভাঙনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অসহিষ্ণুতা দিয়ে কী রাজনীতি হবে! আমাদের সবার উচিত সহিষ্ণু হওয়া, সংযত হওয়া। যারা বাদ পড়েছেন, তারা ২৬-২৭ বছর ধরে কামাল হোসেনের সঙ্গে আছেন। আমি চাই তারা মিলেমিশে কাজ করবেন।’ এ বিষয়ে গণফোরামের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার ভাষ্য, যাদের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের ফ্রন্টে রাখা হলে গণফোরাম ফ্রন্টে কন্টিনিউ করবে না।
এদিকে, গত দেড় মাসে স্থায়ী কমিটির বৈঠক বিগত সময়ের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন কমিটিরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি জানান, দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বোচ্চ ফোরামে। এ আলোচনায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগণ্য বিষয় জোটের রাজনীতি তথা ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ২০ দলীয় জোট কার্যত গৃহপালিত জোট আর ঐক্যফ্রন্ট তো নামে জোট। ফ্রন্টের অন্যতম নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মন্তব্য—‘জোটের তো কোনও প্রোগ্রাম নেই। আলোচনাও নেই।’
গত বুধবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী একজন সদস্য জানান, বর্তমান সরকার বিএনপির ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা রক্ষা করছে। এতে করে রাজপথে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে, এক্ষেত্রে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। আমাদের প্রস্তুতি এখন নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। আর এজন্যই বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে।’
তিনি জানান, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দুটি জোটের তৎপরতা ও কার্যফল নিয়ে আলোচনা করছেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মকৌশল ও পদ্ধতি নিয়ে সদস্যরা সময় ব্যয় করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চেয়ারম্যান ১১ মার্চ রাতে বলেন, ‘‘বিএনপির নেতৃত্ব এখন দলের ‘রাজনীতি’ই ঠিক করতে পারেননি। জামায়াত নিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত নেতৃত্ব সিদ্ধান্তে না আসবেন, এর আগে আন্তর্জাতিকভাবে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনও অর্জন আমাদের হবে না।’’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি কাকে মিত্র মনে করছে, এটার মেসেজ জনগণের কাছে যায়। বলা হচ্ছে, বিএনপি মুক্তিযোদ্ধারের দল, কিন্তু সঙ্গে জামায়াত আছে। মূলনীতি ঠিক হলে জনগণের কাছে বার্তা যাবে। দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে, আন্দোলন-সংগ্রামে রাষ্ট্রের চাপ থাকে, এটা ধরে নিয়েই তো রাজপথে নামা যায়। রাজপথ ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি যেমন হবে না, মানুষের আস্থা তৈরিতেও দল ব্যর্থ হবে, মনে করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুক্ত এই নেতা।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, দলের মধ্যে জামায়াতকে ছাড়া বা রাখা নিয়ে দুটি চিন্তা আছে। তবে, উভয়পক্ষের নেতারা এও জানান, খালেদা জিয়ার মতেই জোটে কন্টিনিউ করছে জামায়াত।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, বিএনপির সামনে তিনটি ধারা আছে। এরমধ্যে কোনটিকে বাছাই করা হবে,তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। তবে, আগামী দিনে রাজপথ থেকেই সঙ্গী বাছাই করতে চায় বিএনপি। রাজপথের কর্মসূচিতে যাকে পাওয়া যাবে, তার সঙ্গেই সম্পর্ক পাতাবে দলটি।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল একটি সূত্রটি বলছে, গণফোরামের ভাঙনের মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নতুনরূপ আসবে। নতুন অবয়বে একাধিক বাম দলকেও দেখা যেতে পারে, এমন আভাস দিয়েছে সূত্রটি। তবে, গণফোরামের সংকটের শেষ দেখেই নতুন পথের দিকে যাবে বিএনপি।
আলোচনায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নাম এসেছে কয়েক নেতার আলাপে। এ বিষয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট একটি অকার্যকর জোট দীর্ঘদিন ধরেই। গত নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে সম্ভাবনা দেখা দিলেও নির্বাচনের পর তারা নিষ্ক্রিয়। বরং বিএনপিতে নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন যাচ্ছে বলে দেখছি। কিন্তু এটাও মনে করি, দুই জোটের ভরকেন্দ্র বিএনপি।’
বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ন্যূনতম ঐক্যের ভিত্তি ভোটাধিকার ফেরাতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন বলে জানান সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এটাও ঠিক, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কর্তৃত্ববাদী সরকার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে, সেই অবস্থায় একক কোনও দল বা জোটের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে, এমন কোনও সম্ভাবনা আপাতত নেই। এ কারণেই সরকারের বাইরে যত প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক শক্তি আছে, তাদের রাজপথে যুক্ত করা দরকার।’ এক্ষেত্রে বিএনপি কার্যকর কোনও ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন না বাম গণতান্ত্রিক জোটের সাবেক এই সমন্বয়ক।
সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপিকে কয়েকটি বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আজকের দিনে বিদ্যমান দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, দখলদারিত্ব ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনে তাদের চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলের ধারাবাহিকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে দলটির আত্মসমালোচনা কী তা মানুষকে পরিষ্কার করা দরকার। জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং কোথায় কোথায় তারা ভুল করেছে, ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে কিনা, এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে পরিষ্কার করতে হবে।’
বিএনপির জোটগত অবস্থান কী হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনা চলছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক মন্দাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। দিনক্ষণ ঠিক করে তো এসব বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তবে, সময় হলেই এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান দেখতে পাবেন।’

  •