কোম্পানীগঞ্জে স্কুলভবন নির্মাণে পুকুর চুরি | ঝুঁকিতে শত শত শিক্ষার্থী

10

আব্দুল আলীম, কোম্পানীগঞ্জ
কোম্পানীগঞ্জে দেড়কোটি টাকার ফ্লাড সেন্টার কাম বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে হয়েছে পুকুরচুরি। ক্লাস শুরুর মাত্র ১বছরের মাথায় ভবনটি ঘোষণা করা হয়েছে পরিত্যক্ত। ভবনটি ভেঙে ফেলতে কালক্ষেপণ করায় শত শত শিক্ষার্থী জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর এটি হচ্ছে উপজেলার ইছাকলস সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনতলা ফ্লাড সেন্টার কাম বিদ্যালয় ভবন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, উপজেলার ইছাকলস সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনতলা বিশিষ্ট ফ্লাড সেন্টার কাম বিদ্যালয় ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার নির্মান কাজ করা হয় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এবং তৃতীয় তলার কাজ সমাপ্ত হয় ২০১৫ সালে। এতে ব্যয় হয়েছে সরকারের ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরবর্তী ২০১৬ সালে ওই ভবনের কয়েকটি কক্ষে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান শুরু করা হয়। এর মাত্র একবছর যেতে না যেতেই ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি রেখটার স্কেলের স্বল্প মাত্রার ভ’মিকম্পে ভবনটির কয়েকটি কলামে বড় ধরনের ফাটল ধরে যায় এবং ভবনটি হেলে যায়। এ অবস্থায় উপজেলা শিক্ষা অফিসার ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহলকে অবহিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভবনটি সম্পূর্ন পরিত্যক্ত ঘোষণাক্রমে তা ভেঙ্গে নিলামে বিক্রির আদেশ দেয়া হয়।
অভিযোগে প্রকাশ, তিনতলা বিশিষ্ঠ ফ্লাড সেন্টার কাম বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে ভূমিকম্পের মাত্রার কোন পরিমাপ করা হয়নি। পাশপাশি সিক্সটিন গ্রেড শিকলের পরিবর্তে ননগ্রেড শিকল দিয়েই নির্মান কাজ সম্পন্ন করা হয়। বালুপথর ইট প্রভৃতি নিম্নমানের ও পরিমানে কম দিয়ে কাজ করার ফলে স্বল্পমাত্রার হালকা ভূমিকম্পেই ভবনটি ফেটে পড়ে ও হেলে যায়। পাঠদান শুরুর এক বছরের মাথায় দেড়কোটি টাকার ভবনটিত ফাটল ধরে হেলে যাওয়ায় নির্মান কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে পুকুরচুরি করা হয়েছে বলে অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করেন।
সূত্র মতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রাধমিক শিক্ষা অফিসার মো. জহিরুল হক ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ও একই বছরের ৬জুন উপজেলা প্রকৌশলী শাহ আলম তিনতলা এই স্কুল ভবনটি ব্যবহার না করার আদেশ দেন। পরবর্তী একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেয়ে সিলেট জেলা শিক্ষা অফিসার বায়েজিদ খান ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল এক স্মারকপত্রে ঝুঁকিপুর্ন ও জরাজীর্ণ ভবনটি জরুরি ভিত্তিতে ভেঙ্গে দিয়ে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রধান খলিলুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন এবং তদন্তকারী প্রকৌশলী পাটিয়ে উক্ত ভবনটি ভেঙ্গে লিলামে দেয়ার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেন। তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল লাইছ,বিজেন ব্যানার্জী ও নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন আচার্য্য গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষা অফিসার নিয়ে ভবনটি পরিদর্শন করে এবং তা ভেঙে ফেলতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘপ্রায় একবছরেও ভবনটি ভাঙা হয়নি। ফলে ভবনটি সম্পূর্ন ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় শতশত শিক্ষার্থী ও মুসল্লিদের মাথার উপর দাড়িয়ে রয়েছে। উপরন্তু পরিত্যাক্ত এ ভবনের সিঁড়ির সাথে সংযুক্ত রয়েছে পাঠদানরত স্কুলের বর্তমান একাডেমিক ভবন। পাশে রয়েছে আরে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীর নূরানী কোরআন শিক্ষাগার কাম মসজিদ। যেকোন সময় ভবনটি হেলে পড়লে শত-শত মানুষের প্রাণ নাশের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লোকমান হেকিম বলেন, পাঠদান করতে গিয়ে সব সময় আমাদের ভেতরে একটা ভয় কাজ করে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। যেকোন সময় ভবনটি ধ্বসে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমি এ ব্যাপারে দ্রæত সমাধানের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি বজলু মিয়া বলেন, বিদ্যালয় ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যবস্থা নেওয়া জন্য অনেক জায়গায় ধরনা দিয়েছি কিন্তু আজ পর্যন্ত সঠিক কোন সমাধান পাইনি। তিনি বলেন, বড় ধরনের দূর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটলে এর দায় কে নেবে? তাই তিনি দ্রæত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন আচার্য্য বলেন, আমি এখানে যোগদানের পর উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে সুপারিশ পাঠিয়েছি। তাদের কাছ থেকে নির্দেশনা পেলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি জানান।

  •