রক্তাক্ত মার্চ মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

5

সবুজ সিলেট ডেস্ক
একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ২১তম দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন- আর কোনো আপস নয়, সাত কোটি মানুষের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের এই দিনেও বিক্ষুব্ধ মানুষের জঙ্গি মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা রাজধানী। রাস্তার মোড়ে মোড়ে খন্ড খন্ড সভা-সমাবেশ থেকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা কেন্দ্র, কলকারখানা। এ দিনও প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রায় নব্বই মিনিট বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এম কামরুজ্জামান ও ড. কামাল হোসেন অংশ নেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে শান্তিপূর্ণ পথে তারা এগোনোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের স্বাধিকারের মূল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ফর্মুলাই মেনে নেব না। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে পৌঁছে এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাব দিবস উপলক্ষে ২৩ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সবাই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে। চ‚ড়ান্ত মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চলতেই থাকবে। বিকালে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মোহাম্মদ দৌলতানা বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ করে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। একদিকে যখন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক চলছে, আওয়ামী লীগ নেতারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সঙ্কট নিরসনে অন্যদিকে বাইরে তখন অমীমাংসিত বৈঠক আরও উত্তেজিত করে তুলছে সংগ্রামী বাঙালিকে। বাড়ছে সভা। বড় হচ্ছে মিছিল। অন্যদিকে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। প্রতিদিনই পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের ছয় থেকে ১৭টি বোয়িং-৭০৭ বিমান সৈন্য ও রসদ নিয়ে ঢাকায় আসছে। সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরেও ভিড়ছে কয়েকটি জাহাজ। বাড়ানো হচ্ছে পাকিস্তান স্থল ও নৌবাহিনীর শক্তি। একাত্তরের এ দিনেই ঢাকায় অবস্থানকারী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেনাসদরে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করার পরপরই অপারেশন সার্চলাইট শুরু করা হবে। এ অপারেশনের মূল লক্ষ্যস্থল হিসেবে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা স্থির করা হয়। এ খবর নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছলেও তিনি তা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না। তার ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট যেখানে তার সঙ্গে সমঝোতামূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, সে মুহূর্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর মানবতাবিরোধী আক্রমণ করতে পারে না। তারপরও তিনি বিষয়টির প্রতি নেতাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেন। এ দিন মগবাজারে এক নারী সমাবেশে সেনাবাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি প্যারা মিলিটারি গঠনের আহ্বান জানানো হয়। নারায়ণগঞ্জের নারীরা নৌমিছিল বের করে। গাজীপুরে জারিকৃত কারফিউ দুপুর ১২টায় ছয় ঘণ্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আবারো কারফিউ বলবৎ করা হয়। ঢাকায় স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্য বর্জন সপ্তাহ পালনের কর্মসূচি নেয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামের এক জনসভায় এদিন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, মুজিবের নেতৃত্বে তত্ত¡াবধায়ক সরকারই স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্থির করবে। মুজিব যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তাহলে বিশ্বের সব স্বাধীনতাপ্রিয় জাতিই স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।

  •