করোনার চিকিৎসায় ঢাকায় আইসিইউ বেড ৬৭টি

10

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত ঢাকার হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ বেডের সংখ্যা ৬৭টি, সারা দেশে ১০৫টি। সংকটাপন্ন রোগীকে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিতে এই আইসিইউ ব্যবহার হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যা করার এখনই করতে হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেছেন, বৈশ্বিক যে চিত্র, তাতে দেখা যাচ্ছে আক্রান্ত রোগীদের ১০ থেকে ১৪ শতাংশের আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

তবে চলতি মাসে করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বলা হলেও ঠিক কতসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে, সে সম্পর্কে এখনো কিছু বলেনি সরকারি কর্তৃপক্ষ।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের কেন ভেন্টিলেটর প্রয়োজন সে সম্পর্কে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সম্পাদক কাজী সাইফউদ্দীন বেননূর বলেন, করোনাভাইরাস প্রথমে আক্রমণ করে শ্বাসনালিতে। যাদের রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা ভালো, তাদের কাশি ও সামান্য শ্বাসকষ্ট হয়ে সেরে যায়। আইসিইউতে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস লাগে যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাদের। ভাইরাস তাদের ফুসফুসে ঢুকে যায়। রোগী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

বক্ষব্যাধির এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ফুসফুসের প্রান্তিক মাথায় একটা পর্দা থাকে। পর্দার একপাশে থাকে বাতাস, অন্যপাশে রক্ত। বাতাস রক্তকে অক্সিজেন দেয়, আর রক্ত দেয় কার্বন ডাই-অক্সাইড, যেটা নিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ বাইরে বের করে দেয়। রোগের প্রথম পর্যায়ে রক্তে অক্সিজেন কমে, কিন্তু কার্বন ডাই-অক্সাইড সহনীয় মাত্রায় থাকে। তখন শুধু অক্সিজেন দিলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়ে অক্সিজেন কমতে থাকে, কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ে। সে সময় রোগীকে অক্সিজেন ঠেসে দিতে হয় আর কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে বের করতে হয়। চিকিৎসকেরা রোগীকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসে রেখে ভাইরাসের নিষ্ক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে সাতটি হাসপাতালে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা দেওয়ার কথা, তার তিনটিতে আইসিইউ আছে। ২০০ শয্যার বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ২৬টি, আড়াই শ শয্যার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটালে ৮টি এবং ৫০০ শয্যার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আছে ২২টি শয্যা। এর বাইরে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালের দুটি শাখায় ৬ এবং নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে সাজেদা ফাউন্ডেশনে ৫ শয্যার আইসিইউ আছে।

ঢাকার বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঢাকা জেলা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও মাদারীপুরের ১৬টি হাসপাতালে একটিও আইসিইউ নেই। একই অবস্থা বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় জেলার হাসপাতালে। তবে ময়মনসিংহ বিভাগে ২৬টি ও খুলনার ডায়াবেটিক হাসপাতালে ৫ শয্যার আইসিইউ আছে।

গতকাল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁরা ভেন্টিলেটরের সংখ্যা বাড়ানোর খুব চেষ্টা করছেন। উল্লেখ্য, সারা বিশ্বেই এখন ভেন্টিলেটরের সংকট তীব্র। যুক্তরাজ্য এ কাজে এয়ারবাস ও রোলস রয়েসকে যুক্ত করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য ডেকেছে জেনারেল মটরস ও ফোর্ডকে। বিশ্বখ্যাত মেডিকেল যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের সহায়তায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের এ মাস থেকে ভেন্টিলেটর তৈরির কাজ শুরু করার কথা।

বেসরকারি হাসপাতাল যা বলছে

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, তাঁরা রোগীদের প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে আইসিইউর সংখ্যা ৩০০-র মতো। তবে তাঁরা চান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকজনের জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল পূর্ণ হলে কাজ শুরু করতে। অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় এই রোগীদের জেনারেল আইসিইউতে রাখাটা বিপজ্জনক। এতে অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে হয়তো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের প্রাধান্য দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে অন্যরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

আইসিইউ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক  বলেছেন, যেকোনো আইসিইউ এই রোগীদের জন্য উপযুক্ত নয়। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের আইসিইউ কক্ষে নেগেটিভ এয়ার প্রেশার থাকতে হবে। এ ধরনের কক্ষের নকশাও আলাদা। এটি অন্য কোনো কক্ষের লাগোয়া বা জনসমাগম হয়, এমন কক্ষের পাশে হতে পারবে না। বাতাস যাওয়া-আসার ব্যবস্থা থাকবে শুধু দরজার নিচ থেকে। বাতাস বেরোবে কিন্তু ঢুকবে না। করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় তাই নির্ধারিত হাসপাতালের বাইরের আইসিইউগুলো কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বিকল্প খোঁজার কথা বলছেন কেউ কেউ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র নাম না প্রকাশ করার শর্তে  বলেছে, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যা করার এখনই করতে হবে। ওই সূত্রগুলো বলছে, দেশের বেশ কিছু হাসপাতালে ভেন্টিলেটরগুলো অকেজো পড়ে আছে। তিনি বলেন, দেশের ৪২৪টি উপজেলা হেল্থ কমপ্লেক্সে ভেন্টিলেটর আছে, যার সিংহভাগ ব্যবহৃত হয় না। এর বাইরে ১০-২০ ও ৩০ শয্যার ৭০টি হাসপাতাল আছে। সেগুলোর কোনো কোনোটিতে ভেন্টিলেটর আছে। সেগুলোর কী অবস্থা, খোঁজখবর নিয়ে কাজে লাগানো উচিত।

তবে ওই ভেন্টিলেটরগুলো কতটা কার্যকর, সেটাও নিয়েও আলোচনা আছে। যেমন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ শয্যার আইসিইউ থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে ৫ বছর ধরে এটি ব্যবহার হয়নি। ভেন্টিলেটরগুলো অচল হয়ে গেছে।

  •