শবে বরাতে শাহাজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.) মাজার ছিল নিস্তব্ধ

7

সবুজ সিলেট ডেস্ক
মূল ফটক ছিল বন্ধ। ছিল না মুসল্লিদের ঢল। মাইকেও নেই জিকিরের সুর। চিরচেনা ভিক্ষুকদের আহাজারি কিংবা সারিবদ্ধ সমাগম আর নানা সুরের সাহায্য প্রার্থনাও নেই। এ যেন এক অচেনা দৃশ্য! তবে এটা কি কোন ভুল জায়গা? এমন প্রশ্ন মনে উদ্ভব হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে ভুল নয়, এ রকমই ছিল গতকাল হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজার!

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাত ৮ টায় মুসলিম উম্মাহের ‘ভাগ্যরজনী’ হিসেবে পালিত শবেবরাতের এমন দৃশ্য দেখে অবাক হবারই কথা! নিশ্চয় সিলেটিবাসী এমন দৃশ্য আর দেখেনি আগে।

মূলত আরবি শাবান মাসের ১৪ তম রাত মুসলিম উম্মাহ পবিত্র শবেবরাত পালন করেন। এ রাতকে কেউ কেউ ‘ভাগ্যনির্ধারক’ রজনীও বলেন। এ উপলক্ষে প্রতি বছর হজরত শাহজালাল মাজারে মুসল্লিদের ঢল নামে, বিকাল থেকেই শুরু হয় জনসমাগম। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পবিত্র এ রজনী উপলক্ষে মুসল্লিরাও হজরত শাহজালাল মাজার জিয়ারতের উদ্দেশে আসেন সিলেটে। সেই সাথে থাকে ভিক্ষুকদের ভিড়।

মুসল্লিরা নামাজ পড়েন, শিরনি বিতরণ করেন, করেন সাধ্যমত দান-খয়রাত। সারা রাত জেগে মাজার মসজিদ প্রাঙ্গণে নফল এবাদতিও করেন হাজারো মানুষ। এমন দৃশ্য হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে সিলেটিবাসীর কাছে অতি পরিচিত হলেও এবার নীরবেই কাটছে শবেবরাত।

সরেজমিনে হজরত শাহজালাল (র.) মাজার ঘুরে দেখা গেছে নীরব, নিস্তব্ধ। বন্ধ করে রাখা হয়েছ সকল গেট। প্রতি বছর যেখানে হাজারো মানুষের কন্ঠে হতো জিকির, দোয়া-দুরুদ আর মিলাদ সেখানে আজ সুনসান নীরবতা। প্রতি বছর যেখানে নিয়মিত ভিক্ষুকের সাথে মৌসুমি ভিক্ষুকের ঢল নামে সেখানে ভিক্ষুকও নেই। তবে মাজারের মূল ফটক বন্ধ থাকলেও ঝর্ণার পাড়ের পাশ দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ করছেন জিয়ারত। আর এসব মুসল্লিদেরকেই ভরসা করে দাঁড়িয়ে আছেন দু-একজন ভিক্ষুক। তবে তাদের কন্ঠেও নেই অতীতের সেই সুর। মৃদু কন্ঠেই জিকির আর সাহায্য প্রাপ্তির আর্তি তাদের।

এছাড়াও মাজার ঘিরে যেখানে চৌহাট্টা-আম্বরখানা সড়ক, চৌহাট্টা-রিকাবিবাজার সড়ক, রিকাবিবাজার-মীরের ময়দান সড়কে থাকতো গাড়ির দীর্ঘ যানজট, আজ সেখানে বিরাজমান শূন্যতা। বরং শবেবরাত উপলক্ষে বাড়ানো হয়েছে প্রশাসনিক নজরদারী। পুলিশ, র‍্যাব আর সেনাবাহিনীর সদস্যরা হজরত শাহজালাল মাজারে জনসমাগম রোধ করতে অবস্থান নিয়েছেন প্রতি ফটকে ফটকে।

এসময় কথা হয় নাহিয়ান জায়গিরদার নামের একজন মুসল্লির সাথে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার কবর এখানে। তাই মনে আতঙ্ক থাকলেও জিয়ারতে এসেছি। খুব সতর্কতার সাথে জিয়ারত শেষ করেই আবার বাসায় ফিরে যাচ্ছি। সবসময় সাধারণত আমার ছেলেকেও সাথে নিয়ে আসি। কিন্তু এবার একা এসে সতর্কতার সাথে জিয়ারতটা শেষ করছি।’

এদিকে হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজারের খাদেম ফতে উল্লাহ আল আমান বলেন- ‘আমরা ধর্ম মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে জামাত আদায় করছি। একই সাথে গেট বন্ধ রেখেছি যাতে মুসল্লিরা প্রবেশ করতে না পারেন। তবুও মানুষ মাজার এলাকার আশপাশ থেকে এসে মাজার আঙ্গিনার বাইরে দাঁড়িয়েই জিয়ারত করছেন। তাদেরকেও আমাদের অনুরোধ হচ্ছে ঘরে থেকে ইবাদত করেন। আর জিয়ারতে আসলেও দূরত্ব বজায় রেখে জিয়ারত শেষ করেই ঘরে ফিরে যান।’

একই দৃশ্য হজরত শাহপরান (র.) এর মাজারেও। অতীতে জাফলং সড়ক লাগোয়া মূল ফটক থেকে একদম ভিতর পর্যন্ত মানুষের প্রচণ্ড ভিড় আর উভয় পাশে ভিক্ষুকদের সারিবদ্ধ দাঁড়ানোর দৃশ্য আগত মুসল্লিদের মনে ভাব গাম্ভীর্য তৈরি করলেও এবার এখানেও ঠিক উল্টোচিত্র। এখানেও নেই মুসল্লিদের আনাগোনা। নেই ভিক্ষুকদের ভিড়। মাজার মসজিদ লাগোয়া মাজারের ফটকটিও বন্ধ। এখানেও নেই সেই পুরনো চিত্র। কেবল তাই না, ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত সিলেট নগরীর চাষনী পীরের মাজার, মানিক পীরের মাজার, সিলেটের প্রথম মুসলমান বুরহান উদ্দিন মাজার ঘুরেও দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। অতীতের শবেবরাতের রাতে এসব মাজারে তিল ধারণের জায়গা না থাকলেও এবার মুসল্লিদে সংখ্যা অতীতের তুলনায় নেই বললেই চলে।

মূলত দেশে করোনা প্রতিরোধে চলছে অঘোষিত লকডাউন। এমনকি জনসমাগম রোধে মসজিদগুলোতে ৫ জনের অধিক মুসল্লি নিয়ে জামাত আদায় করতেও নিষেধ করা হয়েছে। এমন নির্দেশনার পর থেকেই মসজিদগুলোতে জামায়তে ৫ জনের অধিক মানুষ না আসতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই হজরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরাণ (র.) এর মাজারে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধ জারি করা হয়েছিলো। তাই শুরু থেকে জামাত আদায় হলেও মাজারে ভক্ত ও মুসল্লিদের আনাগোনা কমতে শুরু করে।

এদিকে শবেবরাতের রাত উপলক্ষে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের দেয়া নির্দেশনা ব্যাপকভাবে প্রচার করার পাশাপাশি হজরত শাহজালাল, শাহপরান, মানিক পীর, চাষনী পীর মাজারসহ যেসব জায়গায় জনসমাগম হয় সেসব জায়গায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ অবস্থান নিয়ে মুসল্লিদের বাইরে বের না হতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা।

তিনি বলেন, আমরা জনগণকে জিয়ারতে না আসতে বা বাইরে বের না হতে নিরুৎসাহী করছি। একই সাথে জনসমাগম হয় যেসব মাজার ঘিরে সেসব জায়গায় পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। তবুও কিছু মানুষ জিয়ারতে আসছে। তাদেরকে দ্রুত জিয়ারত শেষ করে চলে যেতে বলা হচ্ছে।

  •