শ্রীমঙ্গলে সেচের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি, বিপাকে কৃষক

11

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় কৃষি জমি আবাদে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে । পর্যাপ্ত পানির অভাবের কারণে ইতিমধ্যেই কয়েকশত একর বোরোধানের মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। ভরা মৌসুমে এই অবস্থা চলমান থাকলে আরও বেশি সংখ্যক বোরোর মাঠ নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এই অঞ্চলের চাষিরা।

সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল ৩নং সদর ইউনিয়নের উত্তর উত্তরসুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠে পর্যাপ্ত সেচের অভাবে বড়বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। বোরো ধানের গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।

উত্তর উত্তরসুর গ্রামের বাসিন্দা নেপাল বৈদ‍্য জানান, ১৪ বিঘা জমিতে তিনি এবার বোরো লাগিয়েছেন। কিন্তু পানির অভাবে ৪-৫ বিঘা জমির ফসল পুড়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। তার অভিযোগ, সময় মতো সরকারি সকল খাজনা পরিশোধ করেও পানি পাচ্ছেন না এখানকার কৃষকরা। করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিলে এই ফসলে পরিবার পরিজন নিয়ে দুবেলা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারতাম। ফসল নষ্ট হলে এখন তো বউ ছেলে নিয়ে পথে বসতে হবে আমাদের জানালেন নেপাল।

২২ বিঘা জমিতে এবার বোরো ধান চাষ করে বিপাকে পড়েছেন আরেক কৃষক ওমর আলী। তিনি বলেন, ধানের চারায় ফুল এসেছে আর সেই সময়ে পানির অভাবে চারা শুকিয়ে ধুসর বর্ণ ধারণ করছে। তিনি বলেন, এই ফসল ঘরে তুলতে না পারলে আমরা খাব কি?

একই এলাকার ইন্নান মিয়া জানান, ১২ বিঘা জমিতে এবার বোরোর আবাদ করেছেন। জমি তৈরি, বীজ, চারা রোপণ, সার ও পরিচর্যা করে এ পর্যন্ত চারা বড় করতে সব খরচ করে ফেলেছেন, এখন তিনি সর্বস্বান্ত।

একই অবস্থা এই এলাকার রহমত আলী, মিন্টু বৈদ্য, মা. মইনুদ্দিন, ছবির মিয়া, মংগল মিয়া, ফয়জুল্লাহ, ওমর মিয়াসহ আরও অনেক প্রান্তিক কৃষকের। তারা জানান, ড্যামের অপর অংশে বিলাশের পারে ফসল নেই এমন জমিতে ও বিভিন্ন ফিসারীতে পানি বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ কৃষিকাজের জন্য নির্মিত সরকারী এই ড্যামের পানি থেকে কৃষকরাই বঞ্চিত হচ্ছেন।

কৃষকরা জানান, সেকেলে পানি সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও সহজ করতে সরকার গেল ৫ বছর আগে হাওরের অদূরে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। প্রথম কয়েক বছর এ থেকে সুফল পেলেও এই ড্যাম এখন এ অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের গলার কাটায় রূপ ধারণ করেছে। ড্যাম নির্মাণের পর পানি ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা আনতে লংলা নদী সমবায় সমিতি একটি সমিতি গড়ে তোলা হয়। ভুনবীর ইউপি চেয়ারম্যান চেরাগ আলী এই সমিতির সভাপতি আর সেক্রেটারি স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া।

এ ব্যাপারে গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় কৃষকগণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবর পানি সেচের দাবিতে একটি লিখিত আবেদন করে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া বলেন, আশিদ্রোন, উত্তরসূর ও ভূনবীর এলাকায় এই ড্যামের পানি বণ্টন করা হয়। কিন্তু এবার খরার কারণে গোপলা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে। একই সাথে চারিদিকে পানির চাহিদা বেড় যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ২-১ দিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে যাবে।

ড্যাম অপারেটর সুরুক মিয়াও একই ভাবে খরাকে দুষছেন। তিনি বলেন, পানির জন্য এতদিন কেউ তার কাছে আসেনি। এখন খরার কবলে পড়ে সব জায়গা থেকে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাময়িক এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ড্যামের পানি মাছের খামারে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে সুরুক মিয়া বলেন, আগে দিয়েছি এখন বন্ধ। তিনি জানান, সমিতির সদস্যরা পানির মূল্য হিসেবে কেয়ার প্রতি আধামন করে ধান দেয়ার কথা, কিন্তু বেশির ভাগ কৃষক তাও দেন না। ড্যামের রক্ষণাবেক্ষণে রশিদ মূলে ব্র্যাক ফিসারীতে ৩০ হাজার টাকায় কিছু পানি বিক্রি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘এবার তো বৃষ্টি নেই। ফলে বিলাসের উৎসমুখে পানি কম আসছে। তাছাড়া ড্যাম থেকে উত্তরসূরি পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথে প্রপার কোন ড্রেন নেই। অনেক স্থানে সংস্কার অভাবে ড্রেন মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে পানি যেতে অনেকটা সময় লাগে।

তিনি আরও বলেন, ইউপি সদস্য দুদু মিয়া ও ড্যাম দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সুরুক মিয়াকে বলে দিয়েছি, যতদ্রুত সম্ভব পানি প্রবাহের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে সেচের পানি দেয়ার জন্য। এছাড়া বিলাসে দিকে যে সমস্ত জমিতে আবাদ নেই অথচ পানি চলে যাচ্ছে তা বন্ধ করতে বলেছি’। তিনি জানান এবার শ্রীমঙ্গলে ৯ হাজার ৪শ’ ১২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হচ্ছে। গত বছর এই জমির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩শ’ ৯৫ হেক্টর।

  •