শাবিতে অনলাইন ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

5

শাবি প্রতিনিধি
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) অনলাইন ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে সেশনজট যাতে না হয় সেজন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এবং বাংলাদেশেও করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করার পরপরই সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দিনদিন করোনার রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির দিনও বাড়তে থাকে।

এদিকে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে সেশনজট দেখা দিতে পারে। আর এই সেশনজটের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাবিপ্রবি অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু হঠাৎ করে অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ায় বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী গ্রামের হওয়ায় দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হওয়া তাদের জন্য কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যদের ইন্টারনেটের ব্যয়ভার বহন করাও অতিরিক্ত বোঝা বলছেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে- বন্ধের মধ্যে শিক্ষার্থীদেরকে পড়াশোনামুখী করে রাখতে এবং সেশনজটের সম্ভাব্য ক্ষতি পোষাতে অনলাইন ক্লাস চালু রাখা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনাকাঙ্খিত ছুটির কারণে অনেকে বাড়িতে প্রয়োজনীয় বইপত্র নিয়ে আসেনি। সবার সমান ইন্টারনেট সংযোগ সহজলভ্য না হওয়ায় অনলাইন মেটেরিয়াল্সও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দুর্বল নেটওয়ার্কে ২০/৩০ মিনিট চেষ্টা করেও অনেকে ক্লাস করতে পারে নি। লকডাউনসহ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকে ফোনে রিচার্জ করতে পারছে না। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের আর্থিক অবস্থা এক্ষেত্রে বাড়তি বিড়ম্বনা সৃষ্টি করছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে টাকা না নিয়ে টিউশন, পার্ট টাইম জবের মাধ্যমে নিজের খরচসহ ক্ষেত্র বিশেষে পরিবারকেও সাহায্য করে। ফলে প্রথম দিকে গড়ে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলে পারলেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে এবং আবার অনেকে মোবাইল রিচার্জ করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে।

ইংরেজি বিভাগ শিক্ষার্থী মিছবা উল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের স্নাতকোত্তর প্রথম সেমিস্টারের ৬৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন ক্লাসে ২৫-৩০ জন উপস্থিত থাকেন, তাও নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্য কখন কখন অনেককে সংযুক্ত দেখালেও প্রকৃতপক্ষে লেকচার পরিস্কারভাবে শুনতে পারেন খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের জন্য বেগ পোহাতে হয় মফস্বল এলাকার শিক্ষার্থীদের। বাড়ি থেকে দূরবর্তী স্থানে গিয়ে কোন গাছতলা বেছে নিতে হয় লেকচার শোনার জায়গা হিসেবে। এমতাবস্থায়, অনলাইন ক্লাস আমাদেরকে সামষ্টিকভাবে যে খুব সুফল দিবে সেটা বলা যাচ্ছে না।’

মেকানিক্যাল ইনিঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত বর্ণিকা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশে এসেছে ৯ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সকল ক্লাস, পরীক্ষা ও অফিস বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ এখানে কোনো অনলাইন কার্যক্রমের কথা বলা হয় নি, তার মানে অনলাইন ক্লাসের প্রশাসন থেকে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শিক্ষকরা তাদের স্বেচ্ছায় অনলাইন ক্লাসগুলো নিচ্ছেন, যে ক্লাসগুলোয় অনেক শিক্ষার্থীরাই নানারকম অসুবিধার কারণে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। ফলে অনেকে ক্লাসের বিষয়গুলো জানতে পারছে না। দেশের এই ক্রান্তিকালে সকল শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে এরকম অনলাইন ক্লাসের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বাদশা বুলবুল বলেন, ‘পুরো পৃথিবী যখন কালগ্রাসী করোনার বিষাক্ত থাবায় লাশের মিছিল বইতে ক্লান্ত, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ যখন করোনা ভাইরাসের মহামারী নিয়ে আতংকিত, সবাই যেখানে গৃহবন্দী এবং নিজের জীবন বাঁচানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। এরকম একটি কঠিন সময়ে অনলাইনে ক্লাস চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অমানবিক। আমাদের সিংহভাগ শিক্ষার্থীর প্রাণের দাবী অনলাইনে ক্লাস বন্ধ করা হোক।’

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ দেব অমিয় বলেন, ‘আমরা সবাই ক্রেডিট-সেমিস্টার ফি সমানভাবে দেই। কিন্তু অনলাইন ক্লাসে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারছি না। এক্ষেত্রে যারা অংশগ্রহণ করতে পারছে না তাদের সাথে অন্যায় করা হচ্ছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে হলেও ক্লাসগুলো পরে নেওয়া উচিৎ।’

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, ‘মহামারী করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা ও ফান্ড সংগ্রহের লক্ষ্যে সর্বদা কাজ করে যাচ্ছি। তার মধ্যে অনলাইন ক্লাস করা অনেকটা কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শাবিপ্রবি শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সহ–সভাপতি তৌহিদুজ্জামান জুয়েল বলেন, সারাদেশে করোনা মহামারির প্রকোপে সাধারণ মানুষ যখন প্রচন্ড মানসিক চাপে ভুগছে, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে যখন দুর্বিষহ অবস্থা চলছে এবং যেখানে অনেকের বাড়ি প্রত্যন্ত এলাকায় তখন অনলাইন ক্লাস চালু রাখা একটি প্রচন্ড বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত। আমরা অবিলম্বে এরকম বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।’

অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি সমন্বয় করছেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ফরহাদ রাব্বী।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন বলেন, আমরা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো দেখি৷ অনলাইন ক্লাসে কি কি অ্যাপস ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়গুলো আমরা শিক্ষকদের জানাচ্ছি এবং ব্যবহার করতে ঝামেলা হলে তা দেখছি। এ পর্যন্ত ১৫-২০ জন আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। অনেক শিক্ষক অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে জানেন তাই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন নি। তারা নিজেরাই অ্যাপস ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছেন। তাই, কতজন ক্লাস নিচ্ছেন তার সংখ্যা আমাদের কাছে নেই।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদার বলেন, ‘অনলাইনে ক্লাস আসলে আমাদের দেশে সব কাভার করতে পারবে না। যে সকল শিক্ষার্থী ক্লাসে যুক্ত হতে পারে তাদের কিছু হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আর এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অন্য আরেকজন বুঝলো। অনলাইন ক্লাসই ফাইনাল না, এর মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা ঘরের ভেতর পড়াশোনামুখী হয়ে থাকলো। পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা বাসায় সময়টা কাটালো। এই ক্লাস দিয়ে পরীক্ষা হওয়ার কোন সুযোগ নেই এবং ফাইনাল ক্লাসও নয়। ক্যাম্পাস খোলা হলে বিষয়গুলো নিয়ে রিভিউ ক্লাস দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কিছুদিন ধরে ক্লাস নিচ্ছি এবং শিক্ষার্থীদের বলছি এটি ফাইনাল কোন ক্লাস নয়। আমি তোমাদের কিছু টাস্ক দিয়ে রাখছি তোমরা বাসায় বসে এইগুলো করবে এবং যারা ক্লাসে সংযোগ হতে পারেনি তাদের টাস্কের বিষয়গুলো জানিয়ে দিবে। এইগুলো পরে আমি আবার পড়াবো। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিতে পারছি, তাদের সাথে কথা বলতে পারছি।’

যোগাযোগ করলে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসগুলোর পরবর্তীতে রিভিউ ক্লাস নেওয়া হবে। আর বর্তমানে চলমান ক্লাসে ৭০-৮০% শিক্ষার্থী উপস্থিত হতে পারলে পরবর্তীতে বাকিরা তাদের বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে ক্লাসের বিষয়গুলো জানতে পারবে এবং লেকচারগুলো যেহেতু রেকর্ড করা আছে তাই বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা যেকোন সময় পাবে। এই ছুটির মধ্যে বসে না থেকে যদি একটু পড়াশোনা করে তাহলে সময়টা ভালোভাবে কাটবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে, আমরা কিছুদিন আগে শ্রেষ্ঠ ডিজিটাল ক্যাম্পাস এওয়ার্ড পেয়েছি। প্রযুক্তির দিক দিয়ে আমরা অনেক এগিয়ে। আর এই উদ্যোগের ফলে ছেলেমেয়েদের পরবর্তীতে অনেক কাজে আসবে। একটু নেগেটিভ থাকবেই তবে, পজিটিভ বিষয়গুলো ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

  •