যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মানুষের পাশে নিউইয়র্কের প্রবাসী ডা. ফেরদৌস

28

কামরুজ্জামান হেলাল, যুক্তরাষ্ট্র:

হাজারো বিপদ ও ঝুঁকি মাথায় নিয়েই করোনা মহামারীর এই দুর্যোগকালে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন খ্যাতিমান চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস খন্দকার ও তার দল। কেবল নিউইয়র্ক নয়, একইসাথে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তারা। যেখানেই মানুষের প্রয়োজন, সেখানেই নিউইয়র্কের বাসিন্দা এই প্রবাসী ডাক্তার এবং তার দল। কমিউনিটির মধ্যে পরম আস্থা এবং ভালোবাসার জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন তারা। পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রে। তার মধ্যে অর্ধেকই আবার নিউইয়র্কে। গোটা নিউইয়র্কে চলছে লকডাউন। একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া সবকিছু বন্ধ। এই শহর যেনো একটি ভূতুড়ে নগরী। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সেবা চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সহজ জিনিসও এই মূহুর্তে হয়ে উঠেছে দুর্লভ। চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেক ডাক্তার কার্যত অফিস বন্ধ রাখছেন। এমন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার। সাথে রয়েছে তার চিকিৎসা সেবা দেয়ার দলটি।নিউইয়র্কে ডা. ফেরদৌস খন্দকার এর তিনটি অফিস রয়েছে। তার মধ্যে জ্যাকসন হাইটসের ওয়েস্টার্ন কেয়ার এর ১৫ সদস্যদের দলটিকে নিয়ে শুরুর প্রায় দশদিন অফিস খোলা রেখেই চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন তিনি। তখনো অসংখ্য মানুষ এসেছে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে। এক পর্যায়ে যখন সবকিছু লকডাউন করে দেয়া হয়েছে, তখন এই দলটি বাসায় থেকেই চিকিৎসা দেয়া শুরু করে। কখনো ফোন কল, কখনো ভিডিও কলের মাধ্যমে দু’জন চিকিৎসক বাড়ি থেকেই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠানো, রিফিল দেয়াসহ ডাক্তারি বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন শাম্মী চৌধুরী এবং আমেনা বেগম। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন আবু ইউসুফ টিটু, শামীমা রহমান, শায়লা হোসেন লিসা, রাফিয়া খানম, রোকসানা বেগম পলি, পাপিয়া বেগম, সায়িদা রহমান, চম্পা নন্দী, ব্লাঙ্কা টরিবিও, শকুন্তলা গাইওয়ালি এবং শহীদুল্লাহ খন্দকার। পাঁচজন অপারেটর মানুষের বিভিন্ন উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। এরমধ্যে যেসব রোগীর অবস্থা খারাপ, অথচ হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই রয়েছেন, তাদের বাসায় গিয়ে দেখে আসছেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার নিজে। কিছু কিছু রোগীর সঙ্গে তিনি নিজেই কথা বলে চিকিৎসা দেন। এভাবেই করোনার এই সময়টায় কাজ করে যাচ্ছে ডা. ফেরদৌস খন্দকার এর চিকিৎসা দলটি। কেবল চিকিৎসাসেবা দেয়াই নয়, সাথে সামাজিক ও মানবিক নানা সেবা নিয়ে সবসময়ই পাশে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। অন্য কয়েকজন চিকিৎসক যেহেতু অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন, তাদের রোগীরাও ফোন করছেন। সেই সাথে বিভিন্ন অসুবিধার কথা জানিয়েও শত শত ফোন আসছে ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের কাছে। অনেক ফোনের উত্তর দিচ্ছেন তিনি। চেষ্টা করছেন নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান করার। ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, “এমন সময় আমরা কখনোই দেখিনি। মানুষের নানা ধরণের সেবা দরকার। আমি আমার ছোট্ট দলটিকে নিয়ে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি মানুষের পাশে থাকার”। করোনা আক্রান্ত অনেক রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে পড়তে এসে এখন মহাবিপদে রয়েছেন। আবার অনেকের বাড়িতে খাবার নেই। এমন অসংখ্য মানুষের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার। শুরু থেকেই বিনামূল্যে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও খাদ্য বিতরণের কাজ করেছেন নিরলসভাবে। এখন অনেকটা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দেয়া হচ্ছে এসব সেবা। এসবক্ষেত্রে তার অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও শুরু থেকেই সেবা দেয়ার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ডা. ফেরদৌস খন্দকার আরও বলেন, “হাসপাতালে নেয়ার পর অনেকে নিজের প্রিয়জনকে খুঁজে পাচ্ছেন না। তাদের মুখ থেকে একটু প্রশান্তির ধন্যবাদ শব্দটুকু শোনার জন্যে, হাসপাতালের ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে কাটাতে হচ্ছে। নিজের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করছি এসব মানুষকে একটু স্বস্তি দেয়ার জন্য। অবস্থা এখন এমন যে ১৮ ঘণ্টাই কাজ করতে হচ্ছে”। কেবল তাই নয়, ফেসবুক, ডাক্তারবাড়ী ইউটিউব, নিজের গড়ে তোলা ডিটিভি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। সরাসরি মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। জ্যাকসন হাইটসের নিজের অফিসে এজন্যে স্থাপন করা হয়েছে একটি কন্ট্রোল রুম। সেই রুম থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কাজ চলছে। সেখানে ডা. ফেরদৌস খন্দকার এর সাথে সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তার স্ত্রী দিনা টিপু খন্দকার। এ ছাড়া দু’জন সহকর্মী আব্দুল্লাহ আল মারুফ এবং জুয়েল নূর প্রতিমুহূর্তে কাজ করে যাচ্ছেন। বাসা থেকেই সমন্বয়ের কাজটি করছেন শামীম আল আমিন। ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, “আমাদের কন্ট্রোল রুমেও এখন অনেক কাজ। কখনো চাল ডাল বিতরণ, কখনো স্যানিটাইজার বানানো। কখনো লাইভের প্রস্তুতি। আবার কখনো হাসপাতালে যোগাযোগ করা। কখনো শিশু খাদ্য কিনতে যাওয়া, কখনো সেগুলো মানুষকে দেয়া। সবাই চেষ্টা করছি। আমার সহকর্মীরা পাশে না থাকলে, কাজটা করা সহজ হতো না”। নিউইয়র্কে কাউকে দাফন করা অনেক ব্যয়বহুল। ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার ঘোষণা দিয়েছেন, তেমন বিপদে কেউ পড়লেও পাশে পাওয়া যাবে তাকে। এদিকে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তিনি গড়ে তুলেছেন করোনা সেবা ডট কম নামে একটি প্লাটফর্ম। এই প্লাটফর্ম থেকে যে কেউ ফোন করে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন সহায়তা পাবেন। সেই সাথে নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মানুষকে খাদ্য সহায়তাও দেয়া হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে। এরমধ্যে নিজ এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বারে দু:স্থ্য মানুষের পাশে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, “এটাই সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থণা করি, মানুষের এই দূর্যোগ কেটে যাক”।

  •