ঘরবন্দি সময়ে বাড়ছে শিশুদের মোবাইল আসক্তি

11

স্টাফ রিপোর্টার
সিলেটের একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রবিউল ইসলাম। বাসা নগরীর বাগবাড়ি এলাকায়। গত ১৭ মার্চ থেকে ঘর থেকে বের হতে পারছে না রবিউল। ফলে মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। এই দুই যন্ত্রে সিনেমা দেখে ও বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েই দিন কাটে রবিউলের।
রবিউল বলে, সারাদিন ঘরে বসে তো সময় কাটে না। বাইরের রেরোনোরও সুযোগ নেই। তাই মোবাইলে বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল আড্ডা দিয়ে আর সিনেমা দেখেই সময় কাটাতে হয়।
শিবগঞ্জ এলাকার শিশু টোটন দেব (৫) এবছরই প্রথম স্কুলে ভর্তি হয়েছে। গত প্রায় ২০ দিন ধরে তারও একমাত্রসঙ্গী মোবাইল ফোন। টোটনের মা ব্যাংক কর্মকর্তা সুমা দেব বলেন, বাচ্চা সবসময় ঘরের মধ্যে আটকে রাখা খুব কষ্টকর। আমাকেও ব্যাংকে যেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়েই তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিতে হয়। ঘরে মোবাইলে গেমসে খেলে ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে ভিডিওকলে কথা বলে তার সময় কাটে।
এখন এমন অবস্থা সিলেটের প্রায় সকল শিশু-কিশোররের। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে লকডাউন চলছে। স্কুল কলেজ বন্ধ। বাইরে খেলাধুলা-আড্ডা দেওয়ায় মানা। বন্ধ রয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডও। ফলে এই কদিনে আরও বেশি করে প্রযুক্তিসামগ্রীর দিকে ঝুঁকছে শিশু-কিশোররা। বিশেষত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর টেলিভিশনই হয়ে ওঠছে এই করোনা দিনে তাদের সঙ্গী।
যদিও বিশেষজ্ঞরা সবসময়ই শিশুদের পূর্ণ বিকাশে মোবাইল ও কম্পিউটারের প্রতি ঝোঁক কমিয়ে আনার কথা বলে আসছেন সবসময়ই। তবে এই সময়ে পুরোপুরি ঘরবন্দি অবস্থায় এমন মানা শিশুদের মানাতে পারছেন না বেশিরভাগ অভিভাবকই।
এ ব্যাপারে জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তারেক আজাদ বলেন, শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন-কম্পিউটার যতোটা সম্ভব দূরে রাখাই ভালো। এগুলো তাদের কল্পনাশক্তিকে সীমিত করে ফেলে। এছাড়া চোখ ও মস্তিকেরও ক্ষতি করে।
তিনি বলেন, এখন শিশুদের সারাদিন ঘরে থাকতে হয়। তাদের ঘরে আটকে রাখা খুব কষ্টকর। ঘরে থাকতে থাকতে শিশুরা মানসিক অবসাদেও ভুগতে পারে। এ অবস্থায় তাই অভিভাবকদের আরও মনোযোগি হতে হবে। শিশুদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে। তাদের সাথে গল্প করতে হবে। ঘরের ভেতরে খেলা করতে হবে। বাসার দরজা-জানালা খোলা রেখে বাইরের পৃথিবীটাকে দেখার সুযোগ করে দিতে হবে। সুযোগ থাকলে তাদের নিয়ে ছাদে যেতে পারি।
শিশুদের এই সঙ্কটের কথা বিবেচনা করে এগিয়ে এসেছে সিলেটের কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন। পাঠাশালা নামে শিশুদের সৃজনশীল চর্চার একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নগরীর শিশুদের মধ্যে রং, পেন্সিল, তুলি ও খাতা বিতরণ করা হচ্ছে। ‘দর্পণ’ নামে একটি নাট্য সংগঠন আয়োজন করেছে শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনলাইনে অভিনয় প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় যে কোনো শিশু-কিশোর ঘরে বসে অভিনয়ের ভিডিও করে দর্পণ’র নির্দিষ্ট ফেসবুক পেজে পাঠালে তাদের বাছাই করে পুরষ্কৃত করবে সংগঠনটি।
দর্পণ থিয়েটারের সংগঠক হুমায়ুন কবির জুয়েল বলেন, শিশুদের জন্য আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ এখন শিশুরা সবচেয়ে সঙ্কটে আছে। ঘরে থাকতে থাকতে তারা বিষন্নতায় ভুগতে পারে। তাই শিশুদের ঘরে রেখেই সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত করতে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করা অন্যান্য সংগঠনেরও এ ব্যাপারেও এগিয়ে আসা উচিত।
সিলেটে প্রতিবছর মুক্তিযুদ্ধের বইপড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ইনোভেটর নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই ঘরবন্দি সময়ে তারা অনলাইনে বইপড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। নিজেদের ফেসবুকে পেজে বইয়ের নাম ও পিডিএফ লিংক দিয়ে শিশু-কিশোরদের বইপড়তে উৎসাহী করছে সংগঠনটি। এতে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ইনোভেটরের সঞ্চালক প্রণবকান্তি দেব।
শিশু একাডেমি সিলেট কার্যালয়ের জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা সাইদুর রহমান ভূঞা বলেন, শিশুরা টেলিভিশন দেখুক। তবে তা যেনো সামান্য সময়ের জন্য হয়। বাকি সময়টুকু শিশুদের বিভিন্ন ইনডোর গেমস, বইপড়া এসবে ব্যস্ত রাখতে হবে। ঘরের ছোট-ছোট কাজের সাথেও তাদের অভ্যস্ত করা যেতে পারে। এতে কায়িক শ্রমও হবে। নিজের কাজ নিজে করাও শিখবে। এই সময়ে অভিভাবকদেরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। শিশুদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে।

  •