চাল চুরির অভিযোগে ছেলেসহ আওয়ামী লীগ নেতা আটক

23

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে কালোবাজারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা মূল্যের চাল চুরির অভিযোগে ছেলেসহ আওয়ামী লীগ নেতাকে আটক করেছে র‌্যাব-৯। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৭ বস্তায় ২১০ কেজি চাল জব্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে তারা উপকারভোগীদের চাল সুকৌশলে আত্মসাৎ করে বিক্রি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশনে খবর প্রকাশ হলে বুধবার (২৮ এপ্রিল) রাতে র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের একটি দল অভিযান চালিয়ে চুরিকৃত ২১০ কেজি চালসহ বাবা-ছেলেকে আটক করে।

আটক ডিলার আবু আব্দুল্লাহ ও তার ছেলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছেন, তারা ইসলামপুর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের সরকারি চাল বিভিন্ন সময় সুবিধাভোগীদের টিপসই জাল করে চুরি করে আসছে।

র‌্যাবের এএসপি একেএম কামরুজ্জামান জানান, গত ২৯ এপ্রিল বুধবার কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের উপকারভোগী লোকদের সাথে সাক্ষাত করে এ ঘটনার সত্যতা পান। এরই রেশ ধরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আব্দুল্লাহর মালিকানাধীন গোলের হাওর কাজুর দোকানের গুদামে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের পর তার কাছ থেকে অবৈধভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে ১০ টাকা মূল্যের ২১০ কেজি চাল জব্দ ও এর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দীর্ঘ ৮ ঘন্টার অভিযানে বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টায় আওয়ামী লীগ নেতা ডিলার আবু আব্দুল্লাহ (৫৫) ও তার ছেলে আজিজুর রহমান (২৮) কে আটক করে র‌্যাব।

তিনি আরও জানান, গোলের হাওর ও এর আশপাশের এলাকায় গিয়ে কার্ড নম্বর ৫৭২ সাগর দেব বর্মা, কার্ড নম্বর ৫৭১ সুবাস দেব বর্মা, কার্ড নম্বর ২৬৩ মো. মনির মিয়া, কার্ড নম্বর ৫৭৪ হরেন্দ্র দেব বর্মা, কার্ড নম্বর ৫৬৭ রামচরন গড়, কার্ড নম্বর ৫২৯ রাধা কৃষ্ণ রাজভর, কার্ড নম্বর ৫৬৬ মনু রাম গড় ও কার্ড নম্বর ৫৭৩ প্রবীত দেব বর্মাসহ আরও কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানতে পারেন এ পর্যন্ত ১২ বার চাল বিলির জন্য আসলেও তারা কেউ কেউ একবার, আবার কেউ কেউ ৪-৫ বার পাওয়ার পর আর চাল পাননি। এ চালগুলো সুকৌশলে উপকারভোগীর মাঝে বিলি না করে রাতের আঁধারে অন্যত্র বিক্রি করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে চাইলে বাজার চৌকিদার আটক করলে এর সত্যতাও পাওয়া যায়। সবকিছু বিবেচনা করে তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তাদের কাছ থেকে ৭ বস্তায় ২১০ কেজি চাল উদ্ধার করে ২ জনকে আটক করা হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাব-৯ এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের অধিনায়ক এএসপি আনোয়ার হোসেন শামিম জানান, এসব চাল গরীবের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার। ডিলার আবু আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন থেকে উপকারভোগীদের টিপসই জাল করে চাল আত্মসাৎ করে বিক্রি করে আসছিল এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘরে খাতাপত্রে ২৩ বস্তা থাকার কথা থাকলেও ৩০ বস্তা চাল পাওয়া যায়। উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হান্নান ও স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য মৃনাল কান্তি সিংহ, বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফয়জুল হকের উপস্থিতিতে ডিলার আবু আব্দুল্লাহ ও ছেলে আজিজুর রহমানকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় আরও এরকম অভিযোগ রয়েছে। তদন্তপূর্বক গরীবের হক মেরে খাওয়াদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, তারা দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় বিচারপ্রার্থী হলেও কেউ কোনও কর্ণপাত করেনি। অবশেষে র‌্যাব সদস্যরা তাদের কথা শোনে ন্যায় বিচারের জন্য এগিয়ে এসেছেন।

তারা আরও বলেন, হাতেনাতে চাল চুরির বিষয় প্রমাণিত হলেও ডিলার প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় পার পেয়ে যান। তারা এর সঠিক বিচারেরও দাবি জানান।

উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে তদন্ত করে এর সত্যতা পেলেও অধিক তদন্তের কথা বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক।

তিনি বলেন, তদন্ত করে চাল সরানোর বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এমন কাজ করবে না বলে লিখিত নিয়ে তাকে সাবধান করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ডিলার আবু আব্দুল্লাহ উপকারভোগীদের কাছ থেকে চালগুলো কিনে নিয়েছিলেন।

উপকারভোগীরা চাল পাচ্ছে না এমন বিষয়ে চানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি জানেন না। অভিযোগ পেলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কেউ কেউ ২০১৮ সালে একবার আবার কেউ কেউ ২০১৯ সালের অক্টোবরে পাওয়ার পর এ পর্যন্ত আর পাননি। আবার কারো কার্ড ডিলার নিয়ে গিয়ে আর তাদের চাল দিচ্ছেন না। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

ইসলামপুর ইউনিয়নের চম্পা রায় চা বাগান, সুসমানগর তৈলং বস্তি, গুলের হাওর, কলাবন ফাঁড়ি, সরিষাবিল, সোনারায়সহ বিভিন্ন গ্রামের লোকজন জড়িত হয়ে চাল না পাবার বা বিভিন্নভাবে হয়রানির প্রতিবাদ জানান ইসলামপুর ইউনিয়নের ৫টি ওয়ার্ডের ডিলার আবু আব্দুল্লাহ ও তার ছেলের বিরুদ্ধে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আবু আব্দুল্লাহ ইসলামপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি।

গোলের হাওর বাজারের নৈশ প্রহরী ও বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গত ১৫ এপ্রিল রাতে ডিলারের ছেলে আজিজ একটি সিএনজি অটোরিকশা করে গুদাম থেকে চাল নিয়ে যাবার সময় নৈশ প্রহরী আটক করে গোলের হাওর বাজারের এক মোবাইল ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে চাল নিয়ে যায়। পরের দিনই নৈশ প্রহরী উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার বরাবরে একটি দরখাস্ত দেন। যার তদন্ত প্রথমবার হয়ে প্রাথমিকভাবে ডিলারের চাল চুরির সত্যতা পাওয়া যায়। চাল চুরির কথা ঢাকতে মোবাইলে নৈশ প্রহরীকে ফোন দেন আবু আব্দুল্লাহ্। সেই ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

র‌্যাবের হাতে বাবা-ছেলে আটকের পর এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি সঠিক তদন্ত করলে আরও অনেক ঘাপলা বেরিয়ে আসবে। তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তার ডিলারশিপ বাতিলেরও দাবি জানিয়েছেন।

  •