করোনা সংকটে অসহায়দের পাশে মানবিক পুলিশ

15

 

সবুজ সিলেট ডেস্ক

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে করোনা প্রতিরোধে মাঠে কাজ শুরু সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশ। গত ১১ এপ্রিল সিলেটে লকডাউন ঘোষণা করা হলে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন মধ্য আয়ের শ্রমজীবী মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ায় পুলিশ। জেলা ও মহানগর পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একজন সদস্য পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার পাশাপাশি খাদ্য সহয়তা কার্যক্রম শুরু করেন।

করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন উপজেলায় উপজেলায় গিয়ে অসহায় মানুষের জন্য খাদ্য সামগ্রী নিজ হাতে বহন করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন। নগর পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়াও একইভাবে মহানগর পুলিশের ছয় থানায় নিজে গিয়ে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন এবং সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। এ কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে। অতীতে এমন মানবিক পুলিশকে দেখেননি সিলেটের মানুষ।

চীনের উহান শহর থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাস এখন সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এ থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। ইতোমধ্যে আক্রান্ত দেশগুলোর করোনাভাইরাস মোকাবেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জরুরি পরিষেবা ব্যতীত সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার উপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।

এরই প্রেক্ষিতে কার্যত জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাস ঠেকাতে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে গত ১১ এপ্রিল থেকে সিলেট জেলা লকডাউন রয়েছে। পুলিশের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সরকারের নির্দেশনায় মানুষের মাঝে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, হোম কোয়েরেন্টাইন নিশ্চিত করা, আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানোর মত কাজগুলোও করতে হচ্ছে পুলিশকে। এর বাইরে মানুষের মাঝে সবচেয়ে তাক লাগানো বিষয় হচ্ছে পুলিশ কিছু মানুষের দারে দারে গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি।

সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর থেকে এর প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে সিলেট মহানগর পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নগরের জনসাধারণ বা জনগণকে করোনা সতর্কতা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সর্বোচ্চ প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আসছে। নগরের প্রতিটি অলিতে গলিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি হ্যান্ড মাইক দিয়ে মানুষকে সচেতন করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এসএমপির প্রতিটি থানা ও দফতরে সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আগত সেবা প্রত্যাশী ও পুলিশ সদস্যদের থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যানিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি থানা নিজস্ব উদ্যোগে জনসাধারণের মধ্যে হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক বিতরণ করে যাচ্ছে এবং এসএমপির নিজস্ব জলকামান দিয়ে নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রতিনিয়ত জীবানুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে । নগরে চলাচলরত বিভিন্ন ব্যক্তিগত যানবাহনে জীবানুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।

নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও জনসমাগম স্থলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। বাজার এলাকায় টহল ডিউটির মাধ্যমে সরকার কর্তৃক ঘোষিত নির্দেশনা মেনে চলতে লোকজনকে আহ্বান করা হচ্ছে।

করোনা নিয়ে নগরের মানুষকে সচেতন করার লক্ষে বিভিন্ন ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুনের মাধ্যমে এবং স্যোশাল মিডিয়ায় করোনা সতর্কতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচার প্রচারণা করা হচ্ছে। কেউ যাতে করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সেজন্য সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং করা হচ্ছে।

পাশাপাশি পুলিশের সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া ৬০০ জন অসহায়, গরিব, দুস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী (চাল ৫ কেজি, আলু ২ কেজি, তেল ১ কেজি, পেঁয়াজ ১ কেজি, ডাল ১ কেজি) বিতরণের মাধ্যমে মানবিক কার্যক্রম শুরু করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় সিলেট মহানগর পুলিশের ৬টি থানার উদ্যোগে অসহায়, গরিব, দিনমজুর, তৃতীয় লিঙ্গ, বেদে সম্প্রদায়, রিকশাচালক, ট্রাক ড্রাইভার ও শ্রমিক, চা-শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অনেক সময় যারা চক্ষু লজ্জার কারণে ত্রাণ চাইতে পারে না এমন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রাতের আঁধারে ঘরের দরজায় ত্রাণ সামগ্রী রেখে আসছে পুলিশ। অনেক সময় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভূমিহীন মানুষজন না খেয়ে আছে এমন খবর পেলে থানার ওসিরা নিজ নিজ উদ্যোগে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। নগরে অসহায় পথশিশু, ছিন্নমূল মানুষজনের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করে আসছে সিলেট মহানগর পুলিশ।

এছাড়া পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষ্যে নগরের নিম্ন আয়ের মানুষকে যাতে না খেয়ে রোজা পালন করতে না হয় সেজন্য প্রতিটি থানার উদ্যোগে রমজান মাসের উপহার সামগ্রী বিতরণ করে চলছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস) জেদান আল মুসা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন পত্রিকার হকারদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত অসহায়, গরিব, দুস্থ মানুষদের মাঝে গোপনে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া এসএমপির (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস) শাখার উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস) জেদান আল মুসা জানান, সিলেট নগরে কোনো করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেলে এমন ক্রাইসিস মুহূর্তে আপনজনও কাছে থাকে না। পরিবারের লোকজনও ঝুঁকি নেয় না। তখন সিলেট মহানগর পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করেছে। ইতোমধ্যে নগর পুলিশের পক্ষ হতে পাঁচ থেকে ৬ হাজার পরিবারকে মানবিক সাহায্য (ত্রাণ) বিতরণ করা হয়েছে। এ সব ত্রাণ সামগ্রী পুলিশ অফিসার ও সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়নে বেতন ও রেশন হতে কিছু পরিমাণ সঞ্চয় করে বিতরণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে রাতের আঁধারে ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার ও ওসিরা মোবাইল/টেলিফোনে সংবাদ পেয়ে গোপনে ত্রাণ প্রেরণ করছেন। সিলেট মহানগর পুলিশের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১ এপ্রিল থেকে জেলার ১১টি থানার অনেক এলাকায় কখনও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন নিজে গিয়ে কখনও তার সহকর্মীদের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত এক শ্রেণির মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। এমনকি আত্মসম্মানের ভয়ে সরকারি বেসরকারি সংস্থার সাহায্য থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে ।

এই ধারণা থেকে গত ১২ এপ্রিল পুলিশ সুপার সিলেটের ফেসবুক পেজ থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে এবং একটি হট লাইন নম্বর দিয়ে ফোন কলের ভিত্তিতে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারকে খাদ্য সাহায্যের ঘোষণা দেন পুলিশ সুপার। ইতোমধ্যে জেলা পুলিশের সদস্যরা শুধুমাত্র ফোন কলের ভিত্তিতেই প্রায় ৩ হাজার পরিবারকে গোপনে বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম রমজানে জেলার প্রত্যেক থানায় ১০০ প্যাকেট করে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেন পুলিশ সুপার। প্রাপ্ত ফোনগুলো যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট বা পরিবারের নিকট থানা পুলিশের সদস্যরা কখনও মাথায় করে, নৌকা যোগে, মোটরসাইকেল যোগে, হেঁটে, কখনও সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।

জেলা পুলিশের এমন মানবিক কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাউল শিল্পী বিরহী কালা মিয়া। তিনি জানান, পুলিশের এমন মানবিকতা ইতোপূর্বে তারা কখনও দেখেননি। পুলিশের এমন মানবিক আচরণ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, পুলিশ একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা জনগনের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে দায়িত্ব পালন করে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পুলিশ মানুষের কাছাকাছি থেকে দায়িত্ব পালন করার সুবাধে মানুষের খাদ্য সামগ্রীর কষ্টের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। মূলত এই ধারণা থেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সিলেট জেলা পুলিশ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সাধ্যমত খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছে।

  •