টেকনাফের পোকাগুলো ‘পঙ্গপাল’ নয়

21

সবুজ সিলেট ডেস্ক
কক্সবাজারের টেকনাফে এক ধরনের পোকার উপদ্রব নিয়ে আতঙ্ক তৈরির পর এলাকা পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আতঙ্কের কিছু নেই। যেসব পোকা দেখা যাচ্ছে সেগুলো পঙ্গপাল নয়, বরং এগুলো ঘাসফড়িং প্রজাতির বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ববিদরা। শনিবার (২ মে) দুপুরে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী এলাকা পরিদর্শন শেষে এসব কথা বলেন তারা। ঢাকা থেকে সকালে টেকনাফে পৌঁছান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ববিদদের নিয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি দল।

এসময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কীটতত্ত্ববিদ সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা এখানে এসেছেন। ইতোমধ্যে জনমনে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে টেকনাফের এই অঞ্চলটাতে পঙ্গপাল চলে এসেছে। আসলে আমরা সরেজমিনে দেখলাম যে পোকাটা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি এটি বিধ্বংসী পোকা পঙ্গপালের মতো নয়। যেটা আমরা ইতোমধ্যে জাতীয়ভাবে শনাক্ত করতে পেরেছি এটি একটি ঘাস ফড়িং। এটি বিভিন্ন বনজঙ্গলে এবং ক্ষেত্র বিশেষে কিছু ফসলের ক্ষতিকর পোকা। এটা তেমন ক্ষতি করে না, এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের পোকা আরও আগে থেকে বাংলাদেশের রেকর্ডে ছিল। এটা আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও জেনেছি। এখানে এটা আগে থেকেই পরিচিত একটি পোকা। স্থানীয় একজন কৃষক আমাদের বলছেন, এটা বর্মাচান্ডালী নামে পরিচিত। কেন এটা বর্মাচান্ডালী নামে পরিচিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা যেহেতু বার্মা থেকে এসেছে সেই জন্য এই নাম বলা হয়। আসলে আমাদেরও ধারণা এটি বার্মা (মিয়ানমার) থেকে আসতে পারে। এটা শুধু বাংলাদেশের রেকর্ডের না ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি দেশে উপস্থিতি আছে। সব দেশে ক্ষতিকারক পোকা হিসেবে চিহ্নিত আছে। কিন্তু আবার এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এটি একটি ঘাসফড়িং জাতীয় পোকা।’

ঢাকা খামারবাড়ি উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, উপপরিচালক মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে এই পোকাটা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। বিষয়টাকে দুশ্চিন্তাই বলা যায়। আমাদের কৃষি ডিপার্টমেন্টসহ সারা বাংলাদেশে সবার এটা নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে আমরা কৃষি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে আলোচনা থেকে বুঝলাম আসলে এটা পঙ্গপাল না, এটা ঘাসফড়িংয়ের প্রজাতি। যেহেতু এখানে এ পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কক্সবাজার এবং স্থানীয় কৃষি অফিস এটা ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করছেন। তারা সাইফার মেট্রিন জাতীয় কীটনাশক স্প্রে ব্যবহার করে এটি দমন করতে পেরেছেন। বেশ কয়েকবার স্প্রে করার পর এখানে জীবন্ত একটি পোকাও দেখা যায়নি। সর্বোপরি এখানে আশেপাশেও এই পোকার আক্রমণের কোনোকিছু দেখা যায় নাই। প্রত্যেকটি ব্লগে যেন মনিটরিং করে দেখা হয় কোনও গাছে, সবজি বা ধান ক্ষেতে এই পোকা পাওয়া যায় কিনা। যদি এই পোকা পাওয়া যায়, তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন। যেহেতু দমন ব্যবস্থা খুব সহজ, সাইফার মেট্রিন জাতীয় বালাইনাশক স্প্রে করলে এটা দমন হয়ে যায়, তাই চিন্তার কোনও কারণ নেই। যদি বেশি পরিমাণ পোকা দেখা যায়, তখনই আমরা এই সাইফার মেট্রিন জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করবো, পোকা এভাবে দমন করা সম্ভব। এটা পঙ্গপাল নয়, এটা ঘাসফড়িং। এটা নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। এরপরও পোকার নমুনা সংগ্রহ ঢাকা গবেষণাগারে নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা ও মনিটরিং রেখেছি যাতে ব্যাপকভাবে অন্য কোথাও এর আবির্ভাব না হয়।’
টেকনাফে পতঙ্গের আক্রমণস্থল পরিদর্শন করেন বিশেষজ্ঞরা

কক্সবাজার জেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী পরিচালক মো. আবুল কাশেম জানান, ‘পঙ্গপাল বলে প্রচার হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো পরিদর্শন করেছি। এগুলো পঙ্গপাল নয়। কীটনাশক স্প্রে করার পর পোকা নেই। এ ধরনের পোকার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের তিন জন কর্মকর্তা পরিদর্শন করেছেন।’

টেকনাফে ফলের বাগানের মালিক সোহেল সিকদার জানান, কীটনাশক ছিটানোর পর এসব পোকা মরে যায়। দুপুরে কৃষি বিভাগ থেকে একটি টিম এসে যাচাই করে। এ সময় কিটনাশক স্প্রে করা হয়। এসময় কিছু পোকাও সংগ্রহ করেন তারা।

উল্লেখ্য, টেকনাফের লম্বরী গ্রামের একটি বাড়ির আম গাছসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছের শাখা-প্রশাখায় সম্প্রতি দেখা মেলে এক ধরনের এ পোকা। পোকাগুলো গাছের পাতা সম্পূর্ণ রূপে খেয়ে ফেলছে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এলে বেশ হইচই পড়ে যায়। কৃষি বিভাগও নড়ে চড়ে বসে।