রমজানের আমেজ নেই গোলাপগঞ্জে

18

সবুজ সিলেট ডেস্ক

‘রমজান মাস আসার কিছুদিন আগে থেকে অনেক আগ্রহের মাঝে থাকতাম। কবে আসবে সেই রহমত, নাজাত, মাগফিরাতের দিন। যে মাসে আল্লাহ সকল গোনাহ মাফ করে দেন। রমজান মাস এলে মনের মধ্যে কিছুটা প্রশান্তি মিলে। রমজানের প্রতিটা দিনরাত অনেক ভাল ভাবে চলে যায়। কিন্তু এবারের রমজান যেন ঠিক উল্টো। অন্যান্য বছর রমজান এলে মনে যে খুশি লাগতো সেটা এবার নেই। অনেক কষ্ট লাগে। জীবনে ভাবিনি মৃত্যুর আগে এ রকম একটি রমজান মাস দেখতে হবে।’

অনেকটা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কথাগুলো বললেন সত্তরোর্ধ্ব শরিফ মিয়া। যিনি সারা বছর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করতেন। কিন্তু মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে মসজিদে বেধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী বাড়িতে এখন নামাজ পড়তে হচ্ছে।

রমজান মাস মুসলিম জাতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। যে মাসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে মাফ করে দেওয়া হয়।

প্রতিবার রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গেই গোলাপগঞ্জ উপজেলা জুড়ে শুরু হয় বাড়তি উৎসবের আমেজ। যেন অন্য রকম একটি মাস মুসলমানদের দুয়ারে। উপজেলা জুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্ট -ফুটপাতে বসে ইফতার সামগ্রী, বাড়িতে বাড়িতে ইফতার পার্টির দাওয়াত, বাড়িতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে খুশির সাথে ইফতার করা, মসজিদে মসজিদে তারাবির নামাজে মুসল্লিদের ভিড়।

তবে এবার গোলাপগঞ্জে নেই রমজানের আমেজ, নীরবে চলে যাচ্ছে সওয়াবের মাস। ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে এবারের রমজান মাস।

বিশ্ববাসী এক অজানা প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিদিন লড়াই করছে। প্রতিদিন প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের থাবায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবার। কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে একেকটি তরতাজা প্রাণ। আক্রান্ত করে যাচ্ছে হাজার-হাজার মানুষ। প্রতিটা দিন আতঙ্কের মধ্যে যাচ্ছে। যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত নয় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে সবচেয়ে বেশি। কখন যেন আমাকে ধরে ফেলে।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারের রমজানে নেই উৎসবের আমেজ। হোটেল-রেস্টুরেন্টে কিছুটা ইফতারির আয়োজন থাকলেও উপজেলার কোথাও ফুটপাতে নেই ইফতারির দোকান। উপজেলা প্রশাসন থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবার রমজানে ফুটপাতে ইফতার সামগ্রীর দোকান বসতে পারবে না। নেই বাড়িতে বাড়িতে জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, বন্ধু-বান্ধাবদের আমন্ত্রণে ইফতার পার্টি। তারাবির নামাজে নেই মুসল্লিদের ভিড়। উপজেলার সবার বাড়ি যেন এখন মসজিদে রূপ নিয়েছে। বাড়িতে সবাই নামাজ, ইবাদত বন্দেগি করছেন।

রোববার (৩ মে) সকাল থেকে রমজানের ৯ম দিনে উপজেলার গোলাপগঞ্জ , হেতিমগঞ্জ, ঢাকাদক্ষিণ, ভাদেশ্বর বাজার সহ বেশকিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাজারগুলোতে একটু লোকসমাগম থাকলেও বিকালের পর একেবারেই শূন্য।

যেখানে রমজান মাস আসলে প্রতিদিন সকালে মসজিদে -মাদ্রাসায় শুরু হতো মাসিক কোরআন শিক্ষা প্রতিযোগিতা, যোহরের নামাজের পরে মসজিদ গুলোতে শিশুদের মক্তব, পাড়ার সকল যুবকরা নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন, আসরের নামাজ শেষে মসজিদে বসে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত শুনতেন, এরপরে কিছু সময়ের জন্য ইফতারের আগ পর্যন্ত চার/পাঁচজন করে ঘুরতে বের হতেন, মসজিদ গুলোতে ইফতারের আয়োজন করা হতো, বিভিন্ন মসজিদে দেখা গেছে, যারা নামাজে যান, তারা বাসা থেকেই ইফতার নিয়ে গেছেন। ইফতার পর পুরুষ-মহিলারা ছুটতেন মার্কেটে ঈদের কাপড় কিনতে। কিন্তু এবার আর সেটি নেই। ধারণা করা হচ্ছে এবারের ঈদটাও এভাবে নীরবে চলে যাবে। বাজারে আতর, তসবিহ, টুপি ফেরি করে বিক্রি করার যে রীতি ছিল, এবার তারও দেখা মেলেনি।

প্রতিবছর রমজান মাসকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের মধ্যে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। কিন্তু এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে এমন চিত্র নেই। সবমিলিয়ে এবার গোলাপগঞ্জে নেই রমজানের আমেজ, নীরবে চলে যাচ্ছে সওয়াবের মাস।