সিলেটে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবার ৬৩ জন আক্রান্ত

22

স্টাফ রিপোর্টার
করোনার ছোবল প্রতিদিনই শক্তিশালী হচ্ছে সিলেটজুড়ে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। শুধু সাধারণ মানুষই নন, স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িতরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যে সিলেটজুড়ে চিকিৎসক, নার্সসহ ৬৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। দেশের প্রথম চিকিৎসক হিসেবে করোনাক্রান্ত হয়ে যিনি মারা গিয়েছিলেন, তিনিও সিলেটের।

আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে সিলেট বিভাগের চার জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত ৬৩ জন। তন্মধ্যে সিলেট জেলায় ২৭ জন, হবিগঞ্জে ২৫ জন, সুনামগঞ্জে ৭ জন ও মৌলভীবাজার জেলায় ৫ জন রয়েছেন।

আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জন চিকিৎসক, ১৭ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক, ১ জন ডিপ্লোমা চিকিৎসক এবং ১০ জন নার্স রয়েছেন। বাকিরা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যকর্মী।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে বলেন, ‘আমাদের হিসেবে এ পর্যন্ত ৮ জন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত ৪১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এ হিসাবে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং আজকের কতোজন আক্রান্ত হয়েছেন, সেটা যোগ করা হয়নি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট বিভাগে যেসব চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী করোনা (কোভিড-১৯) চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত নন, তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন। মূলত আক্রান্তদের মধ্যে সিংহভাগই করোনা চিকিৎসায় জড়িত নন।

তবু তারা আক্রান্ত হচ্ছেন কিভাবে? এমন প্রশ্নে ডা. আনিসুর রহমান বলেন, ‘এজন্য মানুষের অসেচতনতা দায়ী। বারবার মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে। তবু মানুষ অযথাই ঘর থেকে বাইরে বেরোচ্ছে। অনেক মানুষ আছে যারা করোনাক্রান্ত কিন্তু তারা জানে না। তাদের মধ্যে উপসর্গও হয়তো নেই। আবার অনেকের উপসর্গ থাকলেও সেটা গোপন রেখে করোনার পরীক্ষা করাচ্ছে না। এসব মানুষের দ্বারাই সুস্থ মানুষেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, যারা সাইলেন্টলি ইনফেক্টেড (নিরবেই আক্রান্ত, উপসর্গ নেই বা আক্রান্ত বলে জানে না), তারাই ভয়ের কারণ।’

তিনি বলেন, ‘যারা করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, তারা আগে থেকেই সতর্ক হয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু যারা সাধারণ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, তাদের কাছে সব ধরনের রোগীরা আসছেন। এদের মধ্য থেকে কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে তার মাধ্যমে চিকিৎসক বা নার্সরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।’

এদিকে, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা একের পর এক আক্রান্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই। তবে এ নিয়ে ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’ বলে মন্তব্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা ডা. আনিসুর রহমানের।

তথ্যানুসারে, সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট জেলাতেই স্বাস্থ্যসেবায় জড়িতরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এখানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৭। সিলেট বিভাগে সর্বপ্রথম করোনা রোগী যিনি শনাক্ত হয়েছিলেন, সেই ডা. মঈন উদ্দিন সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেটে বসবাস করতেন। যদিও তার বাড়ি ছিল সুনামগঞ্জের ছাতকে। গেল ৫ এপ্রিল তিনি আক্রান্ত হন, ১৫ এপ্রিল ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান।

ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন ছাড়াও এ হাসপাতালের এক ইন্টার্ন চিকিৎসক গত ২৩ এপ্রিল আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। এছাড়া শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের এক স্টোরকিপার এবং জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক স্টোরকিপারও (২৪ এপ্রিল) করোনায় আক্রান্ত। পরে জকিগঞ্জের ওই স্টোরকিপারের অ্যাটেনডেন্সও গত ১ মে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন।

এদিকে, গত ২৭ এপ্রিল এক চিকিৎসক দম্পতি করোনায় আক্রান্ত হন বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মন্ডল। আক্রান্ত ওই দম্পতির স্বামী ঢাকায় স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত। কয়েকদিন আগে তিনি সিলেটে আসেন। তার স্ত্রী সিলেটে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে কর্মরত।

গতকাল সোমবার (৪ মে) রাতে একই সাথে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ ইন্টার্ন চিকিৎসক করোনা পজিটিভ বলে ধরা পড়েন। এরা সবাই মেডিকেল কলেজের ৫৩তম ব্যাচের। এরা সবাই হাসপাতালের ইন্টার্ন হোস্টেলে থাকেন। এর আগে গত ২৩ এপ্রিল যে ইন্টার্ন চিকিৎসক করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন, তিনি বর্তমানে হোস্টেলেই আইসোলেশনে আছেন। তিনি আক্রান্ত হওয়ার পর হোস্টেলের ৭৮ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৬ জন নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার (৫ মে) জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুই নার্সসহ ৩ জন করোনাক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুুল্লাহ আল মেহেদি এই তথ্য জানিয়েছেন।

এছাড়া আজ সিলেটের পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের এক চিকিৎসক করোনাক্রান্ত বলে ধরা পড়েছেন।

সিলেটের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হবিগঞ্জ জেলায়। এ জেলাতে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ আক্রান্তের সংখ্যা অন্তত ২৫। তন্মধ্যে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের এক চিকিৎসক, দুজন নার্স, প্যাথলজি বিভাগের ২ জন, ২ জন ব্রাদার, ২ জন চালক, ১ জন ঝাড়ুদার ও ১ জন আয়া করোনায় আক্রান্ত। গত ২৬ এপ্রিল এ হাসপাতাল লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তবে গতকাল সীমিত পরিসরে এ হাসপাতাল খুলে দেওয়া হয়েছে। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক ও দুই নার্র্স, চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক ও এক নার্স এবং মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক ব্রাদার করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। লাখাই ও চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন।

এছাড়াও গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) হবিগঞ্জ সদরের এক চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। গত শুক্রবার (১ মে) এক চিকিৎসক, এক নার্স ও দুই স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হন।

আজ মঙ্গলবার (৫ মে) হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের এক স্বাস্থ্যকর্মী এবং নবীগঞ্জের এক স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান।

করোনায় সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবায় জড়িতরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। গত ২৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, অ্যাম্বুলেন্সচালক ও এক স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন। পরে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসকও আক্রান্ত হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার (৫ মে) সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে একজন ডিপ্লোমা চিকিৎসক ও দুজন নার্স আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন।

গত রবিবার (৩ মে) মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের এক চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত বলে নমুনা পরীক্ষায় ধরা পড়ে। চিকিৎসকের বাড়ি রাজনগর উপজেলায়। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) সদর উপজেলায় এক চিকিৎসক এবং শ্রীমঙ্গলে এক এক্সরে টেকনিশিয়ান পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। ওই টেকনিশিয়ান কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিলেন।

এদিকে, যারা কোভিড-১৯ চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত, তাদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যে সিলেট জেলায় চিকিৎসক-নার্সদের জন্য একটি হোটেল নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি জেলায়ও হোটেল-গেস্ট হাউজ খোঁজা হচ্ছে।

  •