যানের চাকা না ঘোরায় সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন

27
ছবি- রাধে মল্লিক তপন

সেলিম হাসান কাওছার
যানবাহনের চাকা ঘুরলে যাদের জীবনের চাকাও ঘোরে। করোনা ঠেকাতে সরকারি ছুটির মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তাদের জীবনে নেমে এসেছে অচলাবস্থা। এখন শুধু তাদের চোখে পানি। করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি চলছে। বন্ধ রয়েছে সবরকমের গণপরিবহন। সড়কে ঘুরছে না গাড়ির চাকা। থেমে আছে পরিবহন খাতের মানুষের জীবন-জীবিকা। এতে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবহন শ্রমিকরা।

‘দিন এনে দিন খাওয়া’ এই মানুষদের উনুনে আগুন জ্বালাতেও বেগ পেতে হচ্ছে। এমন দৈন্যদশায় জীবন কাটছে সিলেট জেলার প্রায় ৬০ হাজার গণপরিবহন শ্রমিকের। সরকার, পরিবহণ মালিক, শ্রমিক নেতাসহ কারো থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা মিলছে বলেও অভিযোগ করছেন তারা। পরিবহন বন্ধের ১৫/১৬দিন পর একবার শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও আর হয়নি। ২৬ মার্চ করোনা ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে ছুটি ঘোষণার পর সড়কপথে গণপরিবহন, নৌপথে লঞ্চ এবং রেলপথে মেইল ও লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়।
জকিগঞ্জের বাস চালক আব্দুল মালেক জানান, সিলেটের জকিগঞ্জ সড়কে বাস চালাতেন তিনি। তার এই বাসে হেলপারসহ তিনজনের সংসার চলত। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় চোখে যেন অন্ধকার দেখছেন। কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না। তিনি আরো বলেন, অনেক পরিবহন শ্রমিক এখন জীবন চালানোর তাগিদে সুযোগ পেলে দিনমজুরের কাজে যাচ্ছেন।

ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন গোলাপগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছায়েল আহমদ বলেন, পরিবহন বন্ধের ১৫/১৬ দিন পর আমার উপজেলার প্রায় এক হাজার শ্রমিকদের মধ্যে ২০০জন শ্রমিকদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে দৈন্যদশায় জীবন কাটছে শ্রমিকদের। কেউ তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে না। এখনও সরকারি কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি।
পরিবহনের হেলপার আনোয়ার বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা সাধারণ শ্রমিকরা কোনো ধরনের সহায়তা পাইনি। আমরা কি খাই, কেমনে চলি কেউ দেখে? বাসা ভাড়া আছে, কত খরচ আছে। আমরার তো পুঁজি নাই যে ভাইঙা খামু। গাড়ি যদি এভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখে আমরা কেমনে চলমু?’ পরিবহণ মালিকদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে না বলেও জানান এই পরিবহণ শ্রমিক। জীবন বাঁচানোর তাগিদে খুঁছেন দিনমজুরের কাজ!

নাম প্রকাশ না করা শর্তে অনেক ট্রাক ও বাস শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, শ্রমিক ইউনিয়নের ফান্ডে যখেষ্ট পরিমাণ টাকা থাকা সত্তে¡ও তারা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এই দুর্দিনের সময়ে শ্রমিক নেতারা খোঁজখবর নিচ্ছেন না।
সিলেট জেলা ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শ্রী আবু সরকারের সাথে আলাপ করা হলে তিনি বলেন, জেলার ১৫ হাজার শ্রমিকদের মধ্যে আমরা ৩ হাজার শ্রমিকদের ৯ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দিয়েছিলাম। শ্রমিকদের প্যাকেটে ছিল দশ কেজি চাল, দুই কেজি আলু ও এক কেজি পেঁয়াজ। তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে যাওয়ার পর তিনি ১১ হাজার ৫’শ ৪৯ জন শ্রমিকদের লিস্ট নিলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো ধরনের সহায়তা করা হয়নি। এমন অবস্থায় মালিক সমিতি ও সরকার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। পরিবহন বন্ধের পর থেকে আমাদের শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সেলিম আহমদ ফলিক বলেন, সিলেট জেলার প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের বাস মিনিবাসের কার্ডধারি ১০হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এপ্রিলে একবার শ্রমিকদের ফান্ড তহবিল থেকে শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছিল। ত্রাণের প্যাকেটে ছিল দশ কেজি চাল, তেল এক লিটার, আলু দুই কেজি ও ডাল এক কেজি। ওই শ্রমিক নেতার দাবি, শ্রমিক ফান্ডে থাকা ৬০ লাখ টাকা শ্রমিকদের মধ্যে বিলি করেছেন।

এ ব্যাপারে সরকারি সাহায্যের ব্যাপারে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আবুল কালাম বলেন, সিটি মেয়র, উপজেলাগুলোর ইউএনও, চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রদের মাধ্যমে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের আলাদা কোনো ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে না।

  •