১৭ বার, মৃত ব্যক্তির নামও

24

স্টাফ রিপোর্টার::
একই নাম্বারে ১৭ বার, আছে মৃত ব্যক্তিদের নামও। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে আড়াই হাজার টাকার নগদ সহায়তা কার্যক্রমে উপকারভোগীদের তালিকায় নয়ছয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা ও জকিগঞ্জ উপজেলায় একই মোবাইল নম্বর ১৭ বার ও মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা হয়েছে। রয়েছে অনেক বিত্তশালী এবং জনপ্রতিনিধির আত্মীয়স্বজনের নামও।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার জৈন্তাপুর ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আলীর ছোট ভাই শাহীন আহমদ। সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা অস্বচ্ছল পরিবারকে ২ হাজার ৫শ’ টাকা করে নগদ সহায়তা কার্যক্রমের তালিকায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার (০১৭৭৯৩১২৬৭৩) দেওয়া আছে ১৭ বার।
তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ বদরুল আলমের নাম্বার দেওয়া আছে আরো ৪ বার। এ ওয়ার্ডের ১৬০ জনের তালিকার বিপরীতে ইউপি সদস্যেও ছোট ভাই ও গ্রাম পুলিশের নাম্বার ২২ ব্যবহার করা হয়েছে। তারা বলছেন, ইউপি সদস্য শওকত আলী কৌশলে তার আত্মীয়স্বজন ও অনুসারীদের নাম তালিকায় দিয়েছেন। এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক হতদরিদ্র ও কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শওকত আলী প্রতিবেদককে জানান, কাজটি দ্রুততার সাথে করতে গিয়ে এরকম হয়েছে। তাছাড়াও অনেকের মোবাইল নাম্বার না থাকার কারণে তাৎক্ষণিক তাদের শনাক্তকারী হিসেবে আমার ছোট ভাইয়ের মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে।
তার পর যাচাই-বাছাইয়ের সময় আমাদের জানানো হয় একই মোবাইল নাম্বার একাধিক নামের পাশে থাকতে পারবে না তখন আমরা তাদের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে পাঠিয়েছি। তবে হতদরিদ্রদের নাম তালিকায় না দিয়ে নিজের অনুসারী ও অত্মীয়-স্বজনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণ জানতে চাইলে এ ইউপি সদস্য জানান, আমার নির্বাচনি প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র্রে লিপ্ত। আমি প্রণোদনার তালিকায় আমার কোনো আত্মীয়স্বজন বা আমার কোনো অনুসারীর নাম দেয়নি। যারা প্রকৃত অসচ্ছল তাদের নাম দিয়েছি।
এ দিকে জকিগঞ্জ উপজেলায়ও মিলেছে সরকার কর্তৃক নগদ অর্থ সহয়তায় অনিয়মের চিত্র। উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার নাজিম উদ্দিনের প্রস্ততকৃত তালিকায় মিলেছে ২ জন মৃত ব্যক্তিসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম। রয়েছে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ। তিনি তার প্রস্তুতকৃত তালিকায় ৩৫ টি জনের নামের পাশে ভুল ঠিকানাও প্রদান করেছেন।
তাছাড়া ওয়ার্ডেও দিনমজুরের নাম বাদ দিয়ে নিজের দলীয় অনুসারী এবং শ্বশুরের নামও দিয়েছেন। ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিনের প্রস্তুতকৃত তালিকায় দেখা যায়, তালিকার ৩১০, ২৭৯ নম্বর ক্রমিকের উভয় ব্যক্তি মৃত। তালিকার ৩০৬, ৩০৭, ৩২২, ৩২৪, ২৯৩, ২৯৪ নম্বর ক্রমিকের ব্যক্তিরা একই পরিবারের সদস্য।
এছাড়াও ২৫৬, ২৫৭, ২৬৩, ২৬৪, ২৬৫, ২৮১, ২৮৮, ২৮৯, ২৯০, ২৯১, ২৯৮, ৩০৩, ৩০২, ৩০৫, ৩২৮, ৩২০, ৩২৩, ৩৩১ ব্যক্তিদের নামের ঠিকানা সঠিক নয় বলে জানা যায়। তালিকার ২৮৬ নম্বর ব্যক্তি ইউপি সদস্যের শ্বশুর বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন জানান, একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে এসব কুৎসা রটনা করছে। তালিকার মৃত ব্যক্তিরা তালিকা প্রস্তুতির পর মারা গেছেন। তবে তালিকায় নামের পাশে ঠিকানা কেন ভুল দেওয়া হয়, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এ ঘটনার সত্যতা মিলেছে একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডেও। ৯ নম্বর ওয়ার্ডেও ১৫২ জনের নামের তালিকায়ও মিলেছে এক নাম্বার একাধিক নামের পাশে। অনেক হত দরিদ্র মানুষের নাম না থাকলেও আছে ইউপি সদস্যের দলীয় অনুসারী, আত্মীয়স্বজনের নাম।
দুস্থদের পরিবর্তে বিত্তশালীদের নামও এ তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে এলাকাবাসীর। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য আবদুল আহাদ বলেন, আমরা স্বল্পসময়ে মধ্যে তালিকা তৈরি করে জমা দিয়েছি। এ কারণেই হয়তো একই নম্বর একাধিক ব্যক্তির নামের পাশে উঠেছে। এ ছাড়া তালিকা তৈরি করার জন্য সময়ও দেওয়া হয়নি। যাদের মোবাইল নম্বর ব্যবহার হয়েছে তারা কেউ আমার আত্মীয় নন।
অনেক সময় আমরা স্ত্রীর নামের পাশে তার স্বামীর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে। অনেকেই তার ভাইয়ের মোবাইল নাম্বার দিয়েছেন। এভাবেই একই মোবাইল নাম্বার একাধিক জনের নামের পাশে আসে। আমরা বর্তমানে সংশোধিত তালিকা পাঠাচ্ছি।
এ ব্যাপারে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন কুমার সিংহের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা পারভীন জানান, আমি এ ধরনের অনিয়মের সংবাদ এখনো পাইনি। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। আমি খবর নিয়ে দেখছি। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

  •