অনুরোধ বা চাপে কোনও পক্ষ নেয় না বাংলাদেশ

9

সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
বিভিন্ন সরকারের আমলে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশকে তাদের পক্ষ অবলম্বন করতে বলেছে। আবার ভারত, চীনসহ অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর। দুই-একটি ঘটনা ছাড়া তারা যেমন বাংলাদেশকে তাদের পক্ষ অবলম্বনের অনুরোধ করেনি, তেমনি বাংলাদেশও সব দিক বিবেচনা করে সব সময় এসব দেশের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান, অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৯০ এর দশকে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তিনি বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেন। আবার এর বিপরীত চিত্রও আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে চীনের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও তাইওয়ানকে ঢাকায় অফিস খোলার অনুমতি দিয়েছিলো বিএনপি সরকার।

কিন্তু সাধারণভাবে বাংলাদেশ সব সময় নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করেছে। ভারতে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক করিম বলেন, ‘আমার মনে পড়ছে না আমরা কখনও কারও পক্ষ নিয়েছি।’

তবে তিনি বলেন, ‘আমার যতদূর মনে পড়ে, জেনারেল জিয়ার সময় একবার আমরা ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অবস্থান নিয়েছিলাম।’

কূটনীতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রতিটি দেশই সমান, কিন্তু বাস্তবে আয়তন, ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে এটি সত্যি নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে ঠিক করতে হবে, এই সম্পর্কের মাত্রা কী হবে এবং আচরণ কেমন হবে। কখনও কখনও কোনও কথা বলা থেকে চুপ থাকা ভালো। আবার কখনও ঝুঁকি না নিয়ে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা সমীচীন। কখন কী করতে হবে, এটি একটি দেশ নিজস্বভাবে নির্ধারণ করে থাকে। আমার মনে হয়, আমরা এখন পর্যন্ত ঠিকভাবে এটি করেছি।’

ভারতে রাষ্ট্রদূত ও চীনে মিশন উপপ্রধান হিসেবে কাজ করা করিম বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে টেনশন থাকবে। চীন সব সময় চায় আমরা যেন তাদের পাশাপাশি থাকি। একই জিনিস ভারতও চায়।’

ভারতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তাদের এ বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং আমি বলেছি, চীন যে পরিমাণ অর্থ দিতে পারে, তোমরা কি সেটি দিতে পারবে।’

চীনের বিষয়ে তারিক করিম বলেন, ‘১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধী হঠাৎ চীন সফর করেন। ওই সফরের দুই সপ্তাহ আগ পর্যন্ত চিরাচরিত ভাষায় চীন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘রাজীবের সফরের পর দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন চীনের কর্মকর্তারা। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমি সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘‘কর্মকর্তারা আমাদের তখন বললেন— দিল্লি ও বেইজিং ‘পঞ্চশীলা নীতি’ প্রণয়ন করেছে। এটি আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আমরা আবারও সেটি উজ্জীবিত করছি। এ বিষয়ে আমরা যথাযথ কাজ করবো।’’

চীনের কর্মকর্তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে ভারতের সঙ্গে বিবাদ মীমাংসা করে ফেলারও পরামর্শ দেন ওই বৈঠকে বলে জানান তারিক করিম।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মাদ তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়াটা সবচেয়ে ভালো এবং এখন পর্যন্ত আমরা সেটাই করছি।’

ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের বিনিয়োগ দরকার এবং সেটি বড় আকারে দিতে পারে চীন। আবার ভারতের সঙ্গে আমাদের বহুমুখী সম্পর্ক আছে এবং তার মধ্যে বিনিয়োগও আছে, তবে পরিমাণে কম।’

কৌশলগত কিছু বিষয়ে অনেক সময় ভারত আমাদের চাপ দিয়েছে এবং প্রয়োজনের খাতিরে সেটি আমাদের মেনেও নিতে হয়েছে বলে তিনি জানান।

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটি আমাদের বজায় রাখতে হবে।’

ভারতে বাংলাদেশের একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাছে সব সময় ভারতের গুরুত্ব বেশি। এটি আগেও দিয়েছি, দিচ্ছি ও ভবিষ্যতেও দিয়ে যাবো। এ বিষয়ে আমরা সজাগ। সব সরকার ভারতকে গুরুত্ব দিয়েছে।’

নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে ভারতকেও কখনও সমর্থন দেয়নি বাংলাদেশ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত ও চীন জানে বাংলাদেশ কোনও পক্ষ নেবে না। আমার মনে হয়, আমাদের এই অবস্থানটি এখনও আছে।’

মিডিয়ায় যেটাই ছাপা হোক না কেন, ভারতের গুরুত্ব কমেনি এবং কমবেও না জানিয়ে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘তবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির যে অবস্থান, সেখান থেকে সরে গিয়ে কোনও অবস্থান নেওয়ার জন্য অনুরোধও করা হয় না। কারণ, তারা আমাদের সীমাবদ্ধতা জানে।’

  •