কুলাউড়ায় কমিউনিটি সেন্টার, মাইক ও ডেকোরেটারর্স ব্যবসায়ীদের মানবেতর দিন-যাপন

38

মোঃ নাজমুল ইসলাম,কুলাউড়া ::
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত সাড়ে চার মাস থেকে টানা বন্ধ রয়েছে সরকারি, বে-সরকারি, সামাজিক ও ধর্মীয় সহ সকল প্রকার আচার- অনুষ্ঠান। এতে মহা বিপাকে পড়েছেন কমিউনিটি সেন্টারের মালিক, মাইক ও ডেকোরেটার্স ব্যবসায়ী সহ বাবুর্চিরা। এছাড়াও পার্লার, ফুলের দোকান, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ভিডিও ক্যামেরা ব্যবসায় জড়িত অনেকেই কর্মহীন হয়ে মহা সংকটে পড়েছেন। বেকার হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসার কাজে নিয়োজিত হাজার হাজার শ্রমিক। জীবন জীবিকার তাগিতে ইতিমধ্যে অনেকে ব্যবসার ধরন পাল্টিয়ে দোকানের সামনে পান-সুপারি, সিগারেট ও কেউ কেউ মাস্ক বিক্রি শুরু করেছেন। আবার বিয়ে- শিন্নির রান্নায় নিয়োজিত অনেক বাবুর্চি এই পেশা ছেড়ে পেটের দায়ে রিক্সা চালানো সহ অন্য পেশায়ও যুক্ত হচ্ছেন।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কুলাউড়া উপজেলায় প্রায় ১৫টি কমিউনিটি সেন্টার একবারে বন্ধ পড়ে আছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও শহরে শত শত ডেকোরেটারসে দোকান,ছোট বড় অনেক মাইক ব্যবসায়ী রয়েছেন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারনে তাদের ব্যবসায় মারাত্মক লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনান্য দোকানপাট খুললেও এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় একদিকে বন্ধ রয়েছে তাদের আয়, অন্যদিকে ফুরিয়ে গেছে জমানো টাকা। ফলে অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন যা কাউকে মুখ খুলে বলতে পারছেন না।

শহর ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অধিকাংশ ডেকোরেটারস দোকান ও দুই তৃতীয়াংশ মাইকের দোকান একবারে বন্ধ। আবার কেউ কেউ কাস্টমার পাওয়ার আশায় দোকান খোলা রাখলেও অলস সময় পার করছেন তারা। দিন শেষে কোনো লেনদেনই না হওয়ায় শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে বাসায়। এদিকে বিয়ে এবং ধর্মীয় অনুষ্টান সেন্টার ও ডেকোরেটার্স বিহীন স্বল্পপরিসরে হওয়ায় বাবুর্চিরা কাজ শূন্য হয়ে পড়েছেন। পরিবারের দৈনন্দিন খরচ জোগাতে কারো কাছে হাত পাততেও পারছেন না, ফলে অনেক বাবুর্চিরা সেই পেশা বাদ দিয়ে কেউ দরেছেন রিক্সার প্যাডেল আবার কেউবা রাজমিস্ত্রি ও কাটমিস্ত্রি পেশায় জড়িয়ে কোনো রকম তাদের সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।

কুলাউড়া ঝনর্কার মাইক এন্ড সাউন্ড সিস্টেমের সাবেক সত্বাধিকারী ও কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যান সমিতির সাধারন সম্পাদক ময়নুল ইসলাম শামীম জানান, করোনার কারনে প্রায় ৪ মাস থেকে জনসভা, ওয়াজ মাহফিল ও মিছিল মিটিং একবারে বন্ধ থাকায় মাইক ব্যবসায় ধস নেমে এসেছে। এছাড়াও এলাকার কেউ মারা গেলে আগে মাইক ভাড়া করে মাইকিং করা হতো কিন্তু তাতেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এখন কেউ আর মাইকের দোকানে আসেনা। যার ফলে এই ব্যবসায় জড়িত সবাই অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

কুলাউড়া আখলিবুন নেছা ককমিউনিটি সেন্টারের মালিক আব্দুস শহীদ বলেন, করোনা ভাইরাসের কারনে তার সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। গত সাড়ে চার মাস থেকে ম্যানেজার ও কর্মচারির বেতন নিজের পকেট থেকে দিয়ে যাচ্ছেন। জিনিষপত্র গুলোতে মরিচা ধরার উপক্রম হয়ে পড়েছে। বিয়ে-শাদীর অনুষ্টান না থাকলে সেন্টারটি বন্ধ করে গুদাম ঘর বানানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

কুলাউড়া ডেকোরেটারর্স মালিক সমিতির সহ সভাপতি কাইয়ুম ডেকোরেটারর্স এর সত্ত্বাধিকারী আব্দুল কাইয়ুম জানান, করোনা আসার সময় থেকে গত ৪ মাসে ৪ শত টাকাও আয় হয়নি বরং চার মাসের দোকান ভাড়া ও কর্মচারী বেতন এখন পর্যন্ত দিতে পারি নি। বর্তমান এই পরিস্থিতিতে এই ব্যবসা ঠিকে রাখা কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে। দোকান খুললেও কোনো ব্যবসা নাই। সব ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আয়োজন বন্ধ থাকায় কেউ ডেকোরেটারর্সের মালামাল এখন আর ভাড়া নেয় না, ফলে কঠিন বিপদে পড়েছেন ডেকোরেটার্স মালিক-শ্রমিকেরা। এ পেশায় জড়িত অনেকেই কোনো উপায় না দেখে দোকানের সামনে ছোট টেবিলে পান-সুপারী আর সিগারেট আর মাস্ক বিক্রি করে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছিন। গত ৪ মাসে উনার প্রায় ৪/৫ লক্ষ টাকা লোকশান হবে বলে তিনি জানিয়েছে।

উপজেলার ব্রাহ্মনবাজারের নামকরা বাবুর্চি চান্দই মিয়া,মীর সাইদুল ইসলাম,আবুল হোসেন ও আব্দুল মান্নান জানান, বিয়ে-শাদী, শিন্নি ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পুরো বন্ধ থাকায় তাদের মতো অনেক বাবুর্চি বতর্মানে অসহায় হয়ে পড়েছেন । দীর্ঘদিন থেকে কাজকর্ম না থাকায় আয় রোজগার একবারে বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আগে অনেকে ত্রাণ দিয়ে সাহায্য করলেও এখন আর কেউ দেয় না, তাই বাবুর্চি সাইদুল এখন রান্নার কাজ ছেড়ে দিয়ে উঠেছেন রিক্সায়। প্রতিদিন রিক্সা চালিয়ে ৩ থেকে ৪শত টাকা আয় করায় পরিবার নিয়ে কিছুটা চলতে পারছেন বলে তিনি জানান। যেকোনো বিয়ে বা শিন্নি বাড়িতে সার্ভিসম্যান হিসেবে কাজ করতেন আব্দুর রাজ্জাক, তিনি বলেন তার মতো প্রায় দুই শত সার্ভিস ম্যান উপজেলায় আছেন কিন্তু করোনার কারনে সবাই এখন বেকার হয়ে মানবেতর জীবর যাপন করছে। আমরা প্রথম থেকে একাজ শিখেছি, আর কোন কাজ জানা নেই, তাই ঘরে বসেই অলস দিন পার করছি। এখন পরিবার নিয়ে চলা কষ্টকর হয়ে পড়েছে তাদের। তবে অনেক ব্যবসায়ী ও কর্মচারী হাল ছেড়ে দেননি তারা বিশ্বাস আল্লাহ সহায়ক থাকলে শ্রীঘই এই করোনা ভাইরাস চলে যাবে, তখন আবার আগের মতো তাদের এই ব্যবসাবাণিজ্য জমজামট হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী।