হাইকোর্টে ২১ আগস্ট মামলার আপিল : পেপারবুক  প্রস্তুত

12

সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
ইতিহাসের বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার ডেথ রেফারেন্সসহ আসামিদের করা আপিল আবেদনের শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়েছে পেপারবুক। এখন হাইকোর্টের বেঞ্চ নির্ধারণ করা হলেই শুরু হবে এ মামলার আপিল শুনানি।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ২১ আগস্ট মামলায় নিম্ন আদালত যাদেরকে সাজা দিয়েছেন। সাজাপ্রাপ্ত যে সমস্ত আসামিরা এখানে আপিল করেছেন এবং ডেথ রেফারেন্স হিসেবে যেটা আছে। নিয়মিত আদালত শুরু হলেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে আবেদন করে শুনানির চেষ্টা করব।

তবে এটা যেহেতু বড় মামলা সেহেতু এটা ভার্চুয়াল আদালতে শুনানি করতেও কোনো অসুবিধা হবে না। তার কারণ এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি মামলা আমরা ভার্চুয়ালি নিষ্পত্তি করেছি। এ মামলায় কাগজপত্রের বিষয়। জজ সাহেবদের হাতে যেই পেপারবুক থাকবে, আমাদের কাছেও সেই একই পেপারবুক থাকবে। তবে কিছুটা অসুবিধা হবে সেটা হলো একজন আসামি ধরার পরে সেই ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কী কী হয়েছিল। সেই আদেশগুলো অনেক সময় দরকার হয়। সেই ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের আদেশগুলো দিয়ে আলাদা একটা পেপারবুক তৈরি করে নেব।

২১ আগস্ট মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের বিশেষ কর্মকর্তা ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান  বলেন, ২১ আগস্ট মামলার পেপারবুক রোববার আমাদের কাছে এসে পৌছেছে। এখন বিধি মোতাবেক মামলার শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নেবেন।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় দেন বিচারিক আদালত। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন। একইসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় এবং ১১ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এরপর গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুই মামলার রায়সহ প্রায় ৩৭ হাজার ৩৮৫ পৃষ্ঠার নথি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়। এরপর এ মামলার পেপার বুক তৈরি করার নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি।

২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি বহুল আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য গ্রহণ করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। পরবর্তীতে এ মামলায় পেপারবুক তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া গত বছরের ২১ জানুয়ারি বিচারপতি শেখ আব্দুল আউয়াল ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এ মামলায় দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক দুই আইজিপি শহুদুল হক ও আশরাফুল হুদা জামিন নিয়ে নেন। এছাড়া ৪৪ আসামির আপিল আবেদন শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। অল্পের জন্য ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তবে হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী। ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন।

তদন্ত শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ জুন দেওয়া অভিযোগপত্রে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। তখন জানা যায়, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে হামলার ছক করা হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে এসেছিল হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর ফলে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর মামলার ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হয়। রায়ে ৪৯ জনকে সাজা দেওয়া হয়।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজির সাবেক আমির ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আব্দুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. উজ্জল, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ।

পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত।

এ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হুজি সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম মাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল ওরফে ইকবাল হোসেন, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু।

তাদের দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, আরেক সাবেক উপ-কমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ সুপার মো. রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ধারায় খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেন আদালত।

  •