করোনায় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ ও সাংবাদিকতা

22

সবুজ সিলেট :: অঙ্কটা তত বেশি নয়, ১০ হাজার। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর উপহার। প্রশংসা যেমন আছে, বিতর্কেরও শেষ নেই। পেয়েছে, গড়ান। প্রবীণ আর নবীন, সাংবাদিক আর সাংঘাতিকের কোনো তফাত রাখা হয়নি, সবই সমানে-সমান। এভাবেই বিবেচিত হয়েছে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের দেয়া প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা বা অনুদান। এ কারণে কেউ কেউ তা নাকি গ্রহণ করেননি। আবার কেউ তা গ্রহণ করে নিজে ভোগ না করে বিলি-বণ্টন করে দিয়েছেন অন্যত্রে।

বৈষম্যে শিকার হয়েছেন উপজেলার সাংবাদিকরা। জেলার সাংবাদিকরা নয়, শহরের সাংবাদিকরা পেয়েছেন। দলীয়করণ করা হয়েছে। এমন নানা অভিযোগ আর অনুযোগ প্রতিনিয়ত ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। দুটি সাংবাদিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় শীর্ষ পদে অবস্থান করায় বিভিন্ন জেলা থেকে মুঠোফোনেও এ নিয়ে নানা ধরনের অনেক কথাও শুনতে হচ্ছে। অভিযোগ-অনুযোগ তো আছেই।

সাংবাদিকদের প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তার চেক নিজেই গ্রহণ করার ছবি বেশ কিছু মিডিয়ায় প্রকাশের পর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করায় আরও বিপত্তি বেধেছে অনেকের। কিন্তু, নিজে ইচ্ছে করেই সেই চেক গ্রহণের ছবি প্রচার করেছি মিডিয়ায়। আলেচনার বিশ্লেষণ জানার তাগিদেই।

আমার সাংবাদিকতা শুরু আশি্র দশকে। স্থানীয় আর জাতীয় নিয়মিত-অনিয়মিত পত্রিকা থেকে এখন বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের জনপ্রিয় মিডিয়ায়। সপ্তাহে দু-একবার পৃথিবীর মানুষ আমাকে দেখে সংবাদ পরিবেশনের সুবাদে। সরাসরি না দেখলেও টেলিভিশনের পর্দায় দেখার সুবাদে নামটাও অনেকে চেনে। একসময় টেলিভিশন সাংবাদিকতায় সংবাদ সংগ্রহে চষে বেড়াতে হয়েছে গোটা উত্তরাঞ্চলে। এখন প্রতিষ্ঠানে জনবল বৃদ্ধি বা জেলাভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়োগ পাওয়ায় কর্মক্ষেত্রের পরিধিটা কমেছে। তবে, পদবির দিক দিয়ে বিচরণের অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী ঢাকাতেও পৌনে তিন বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। যারা একই হাউজে কাজ করেছি, তারা এখন অনেকেই দেশের বড় বড় মিডিয়া হাউজে শীর্ষ পদে রয়েছেন। অনেক টাকা, বাড়ি-গাড়ির মালিক।

সেসব অনেক কথা। অনেক অভিজ্ঞতা। আগের মতো বয়স নেই। নেই জোশও। নিউরো, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ এখন শরীরে নানা রেগের চাষবাস। আর কিছুদিন বাঁচার ইচ্ছে, তাই দেশের বাইরেও চিকিৎসা চলছে। তারপরও থেমে নেই কর্মযজ্ঞ। প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক তাগাদা না থাকলেও এই ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতিতেও প্রতিনিয়ত ছুটে চলা হচ্ছে, পেশাগতদারিত্বে।

আমার সংশ্লিষ্ট ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট কিংবা অনলাইন মিডিয়ায় যারা চোখ বুলায়, তাদেরই দৃশ্যপট আমার ছুটে চলার পথের। সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনে রয়েছে গতানুগতিকের পাশাপাশি এক্সক্লুসিভ। এই করোনাকালীন প্রতিদিনের চিত্র তো অছেই। করোনা আক্রান্ত হয়ে মুত্যু বা করোনা উপসর্গে মৃত্যু এবং আক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের খবরও থাকছে। করোনায় মৃত বা আক্রান্ত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশের বিষয়ে আগে অনেকে বির্তকে জড়ালেও এখন আর তা নেই।

দিনাজপুরে যে কজন সাংবাদিক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশকেই নিয়ে আলাদা এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট আমাকে করতে হয়েছে। এই রিপোর্ট করতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতা এসেছে। রিপোর্ট না করার জন্য মুঠোফোনে জানিয়েছে তৃতীয় পক্ষ কেউ কেউ। এতে নাকি ওই সাংবাদিক হতাশ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে বলে আমাকে জানিয়েছে। আমার প্রশ্ন ছিল, কেন রিপোর্ট করা যাবে না। পৃথিবী জুড়ে যেসব রাষ্ট্রীয় প্রধান, মন্ত্রী, প্রতিষ্ঠানের প্রধান, চলচ্চিত্র, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, গুণীজনরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের নাম কি নিউজে আসছে না? তাহলে, আমার সাংবাদিক ভাইয়ের নাম আসতে বাধা কোথায়?

রিপোর্ট করার পর ওই সব করোনা আক্রন্ত সাংবাদিক আমাকে নিজে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কারণ, করোনা আক্রান্ত সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা যোগাতে এবং তার শুভাকাংখিদের দোয়া চাইতে তার প্রশংসনীয় দিকগুলো রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। তাই, পরে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের কয়েকজন সাংবাদিক নিজে ফোন করে, কেউ আবার ফেসবুকের ইনবক্স ম্যাসেঞ্জারে ছবি পাঠিয়ে তাকে নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য অনুরোধ করেছেন। তাদের নিয়ে রিপোর্টও করা হয়েছে। অসংখ্য মানুষের দোয়া পেয়েছেন তারা। সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন অনেকেই। আমাকে ফোন দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কেউ কেউ উপহারও দিয়েছেন। এটা শুধু দিনাজপুরের চিত্র নয়, বলছি দেশের বেশ কিছু স্থানের।

যে পরিস্থিতি তাতে আমি যে করোনা আক্রান্ত হব না, তার নিশ্চয়তা কিসে? আক্রান্ত হলে আমাকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট করবে কে?

এই করোনা পরিস্থিতিতে নিজের সাথে নিজেকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ঘরে থাকতে চাইলেও দংশিত হচ্ছে বিবেক। ছুটতে হচ্ছে সংবাদের পেছনে। অবিরাম-অবিরত। শুধু আমি নই, করোনাকালীন নিজের সাথে যুদ্ধ করছেন প্রতিটি সাংবাদিক।

বৈশ্বিক সমস্যা করোনা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন নিজের সাথেই। মানুষকে সচেতন বার্তা পৌঁছাতে, ঘরে থাকা মানুষকে গরম খবর, টাটকা খবর জানাতে অবিরাম ছুটছেন সাংবাদিকরা। তারা খবর পৌঁছে দিচ্ছেন, কিন্তু এই নিদাঘ কালে তারা কেমন আছেন, এই খবর নিচ্ছেন না কেউ।

দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমিত পরিসরে হলেও সাংবাদিকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। করোনা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন তিনি। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে ভুল-ক্রুটি থাকলেও এই উদ্যোগ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী প্রশংসার দাবিদার।

এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে দেশের নানা পেশার মানুষের মতো বহু সাংবাদিকও অসুবিধায় নিপতিত হয়েছেন। ‘অসুবিধায় নিপতিত সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তার বিষয়টি আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছিলাম। সে প্রেক্ষিতে এ পরিস্থিতিতে যারা অসুবিধায় পড়েছে, তাদের আর্থিকভাবে সহায়তার জন্য তার নির্দেশনার প্রেক্ষিতে আমরা বিশেষ তহবিল থেকে সাংবাদিকদের সহায়তার করছি।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোল্লা জালাল এ নিয়ে জানিয়েছেন, করোনা মহামারির এই সময়ে দেশে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনা সদস্যদের পাশাপাশি সাংবাদিকরা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ কাজে সম্পৃক্ত সকলের সুরক্ষা থাকলেও সাংবাদিকদের নেই।

এর বাইরেও চাকরিক্ষেত্রে ছাঁটাই, বেতন না দেয়া, কমিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা নিপীড়নের মধ্যেও সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হননি। এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দাবি-দাওয়া, দেন-দরবার, আন্দোলন-সংগ্রাম কম হয়নি। এখনও হচ্ছে। কিন্তু তাতেও ছাঁটাই বন্ধ হচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য বিএফইউজে ও ডিইউজে নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান।

সাংবাদিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী এই দুঃসময়ে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ান। তিনি আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে সাংবাদিকদের সাহস দেয়ার পদক্ষেপ নেন যা ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। শুধু করোনাকালেই নয়, তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট।’ ওই ট্রাস্টের মাধ্যমে সারা বছর ধরে সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। ট্রাস্ট থেকে আবেদনকারীরা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন।

সাংবাদিক নেতা মোল্লা জালাল ঠিকই বলেছেন। আমি নিজে তার সাক্ষী। ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ থেকে চিকিৎসার জন্য আমি নিজে এক লক্ষ টাকা পেয়েছি। চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার তহবিল থেকে আমাকে এক লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এসব পেয়েছি ৩ বছর আগে।

‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ বিভিন্ন ঘটনায় নিহত, আহত, অসুস্থ, দুস্থ্য-অসচ্ছল সাংবাদিক ও সাংবাদিক পরিবারকে সরকারি তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু তা জানেন না অনেক সাংবাদিক। অনেক সময় কতিপয় সাংবাদিক নেতা তা লুটেপুটে খাচ্ছেন। সুস্থ্ মানুষ অসুস্থ্ সেজে, কেউ বিত্তবান হয়েও দুস্থ্য-অসচ্ছল সেজে ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কোনো কোনো সাংবাদিককে তা পেতে সহায়তা করায় কতিপয় সাংবাদিক নেতা সেখান থেকে ৩০-৪০ শতাংশ কমিশনও নিয়েছেন, সপ্রমাণ এমন অভিযোগ প্রচলিত আছে।

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার সঠিক খবর পৌঁছে দিতে সংবাদকর্মীরা সব ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে চলেছেন। ‘আপনি ঘরে থাকুন, খবর আমরা পৌঁছে দেব’ বলে তারা যে তথ্যসেবার বাণী উচ্চারণ করছেন, মিথ্যা রটনা আর গুজব প্রতিহত করে বস্তুনিষ্ঠ খবর জানিয়ে দিতে সদা সচেতন রয়েছেন, ঠিক তখনই পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মহা সংশয়ে রয়েছেন জেলা-উপজেলার সাংবাদিকরা।

করোনা মহামারিতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বই এখন এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। থমকে গেছে জীবন, পাল্টে যাচ্ছে জীবনাচার। চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল, খারাপ খবর। অদৃশ্য করোনাভাইরাসের ভয়ংকর ছোবলে তছনছ হয়ে গেছে বিশ্ব পরিস্থিতি। মহাশক্তিধর দেশগুলোও হাবুডাবু খাচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। বাড়ছে বেকারত্ব ও ক্ষুধা।

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে অবাধ তথ্যপ্রবাহ সচল রাখতে সাংবাদিকরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত সাংবাদিক সমাজ এই দুর্যোগ মোকাবেলায় তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করছে। করোনার সর্বশেষ তথ্য পরিবেশন করে জনগণকেও সচেতন করছে গণমাধ্যমগুলো। পেশাগত এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য সাংবাদিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন বেশ কয়েকজন। সাংবাদিকতা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তেমনি সাংবাদিকদের বিরাট অংশও আজ চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে।

সাংবাদিক নেতাদের প্রতি আহ্বান, আসুন, সাংবাদিকতার মতো একটি মর্যাদাশীল ও মহৎ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বাহক নির্ভীক সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা জোগাতে এই করোনাকালে তাদের পাশে দাঁড়াই। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদেরও পৌঁছে দেই।

লেখকঃ শাহ্ আলম শাহী
স্টাফ রিপোর্টার-
চ্যানেল আই