আল্লামা শফী-শাসনের অবসান: দীর্ঘ ৩০ বছর পর পরিবর্তন

4

সবুজ সিলেট ডেস্ক

চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় আল্লামা শাহ আহমদ শফীর দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্তৃত্বের অবসান হলো। টানা অর্ধশত বছর মাদরাসা মুহতামিম বা মহাপরিচালক ও শিক্ষকতার সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। দেশের প্রধান এবং প্রাচীনতম এই মাদরাসায় এতোদিন ধরে তার কথাই ছিল শেষ কথা। এ মাদরাসার শিক্ষকদের বেশিরভাগই ছিলেন তার ছাত্র। যে কারণে তার সঙ্গে কেউই দ্বিমত পোষন করতেন না। কিন্তু গত কয়েক বছরে ছেলে আনাস মাদানীর প্রভাব বাড়তে থাকে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আল্লামা শফীর সমালোচনা। যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে গত কয়েকদিনে। অবশেষে পদ ছাড়েন তিনি। তার আগে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মুখে তার পুত্র আনাস মাদানীকে বস্কিকার করতে হয়। বুধবার রাতে আনাস মাদানীকে যখন বহিষ্কার করা হয় তখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু পরদিন সকাল থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয় আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করা হয়নি। মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হবে। এ গুজবের সঙ্গে সঙ্গে আবার বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। রাতে সরকারের পক্ষ থেকে মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যদিও আন্দোলনকারীরা এ সিদ্ধান্ত প্রত্যখান করে। রাতে শূরার বৈঠকে পদত্যাগ করেন আল্লামা শফি। মাদরাসার দায়িত্ব দেয়া হয় শুরা কমিটির কাছে। তাকে আজীবনের জন্য উপদেষ্টা বা সদর মুহতামিম নিযয়োগ দেয়া হয়। রাতেই আল্লামা শফীকে মাদরাসা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় নগরীর একটি হাসপাতালে। তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় বসবাস করতে আসছিলেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার শুরা কমিটির বৈঠকে আনাস মাদানীকে বহিস্কারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। শুরা কমিটির সদস্য সালাউদ্দীন নানুপুরী বলেন, বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীকে মাদরাসা থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। গত বুধবার শুরা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া মাদরাসার আরেক শিক্ষক নুরুল ইসলামকে মাদরাসার সব কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সালাউদ্দীন নানুপুরী বলেন, বয়স্ক ও অসুস্থ হওয়ায় মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্বভার শুরা কমিটির ওপর ন্যস্ত করেন। কমিটি মাদরাসা পরিচালনা করবে। প্রয়োজনে তারাই পরিচালক নির্ধারণ করবেন। পরে শুরা কমিটি আহমদ শফীকে সম্মানিত পরিচালক হিসেবে রাখে।
বৈঠকে অসুস্থ আহমদ শফীকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া উপস্থিত শুরা সদস্যরা মাদরাসায় অবস্থান করবেন। দাবি পূরণ হওয়ায় রাতে মাদরাসার ছাত্ররা তাদের আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তবে মাদরাসা এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ছাত্রদের ছয় দফা দাবির প্রথমটি ছিল তাকে বহিষ্কার করা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে সম্মানজনক পদ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়ার দাবিও করে শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রায় সবকটি দাবি আদায় হয়েছে।
এই মাদরাসার মহাপরিচালক হিসেবে দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন আহমদ শফী। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশেরও (বেফাক) সভাপতি পদে রয়েছেন।

হাটহাজারীর ‘বড় মাদরাসা’ নামে পরিচিত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম মাদরাসা দেওবন্দের পাঠ্যসূচিতে পরিচালিত বাংলাদেশের অন্যতম বড় এবং পুরনো কওমি মাদরাসা। সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করে। আহমদ শফী কয়েক দশক ধরে মাদরাসাটির মুহতামিম বা মহাপরিচালকের পদে ছিলেন। মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম বা সহকারী পরিচালকের পদে ছিলেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী। শফীর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে কয়েক মাস আগে হেফাজতের মহাসচিব ও মাদরাসার সহকারী মহাপরিচালক জোনাইদ
বাবুনগরীর সঙ্গে আনাস মাদানীর সমর্থকদের বিরোধ বাঁধে। তাতে বাবুনগরীকে সরিয়ে দিয়ে তারা টিকে গেলেও তার জের ধরে বুধবার আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানিকে অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করে একদল শিক্ষার্থী। তারা আনাস মাদানির বহিষ্কার দাবিতে বিভিন্ন কক্ষে ভাংচুরও চালায়।

হেফাজতে ইসলামের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ মাদ্রাসায় গত বুধবার থেকে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন। ওই দিন তাঁরা আনাস মাদানীসহ কয়েকজন শিক্ষকের কক্ষ ভাঙচুর করেন। তখন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহীকে মাদ্রাসার ভেতরে পেয়ে মারধর করেন ছাত্ররা। তিনি আনাসের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন প্রচারপত্র বিলি করা হয়। তাতে আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি, আনাস কর্তৃক অব্যাহতি দেওয়া তিনজন শিক্ষককে পুনর্বহাল, তাঁর নিয়োগ করা সব শিক্ষককে ছাঁটাই, ছাত্রদের হয়রানি বন্ধ, শুরা কমিটির সদস্য আবদুল কুদ্দুস, নুরুল আমীন, আবুল কাসেম ফেনীসহ বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া এবং একজন দক্ষ আলেমকে মাদ্রাসার পরিচালক নিয়োগ করার দাবি করা হয়। ছাত্রদের বিক্ষোভের একপর্যায়ে বুধবার রাতে জরুরি মাদ্রাসার শুরা কমিটির বৈঠক ডাকেন শাহ আহমদ শফী। রাত সাড়ে ১০টায় বৈঠক শেষে শুরা কমিটির সদস্য মাওলানা নোমান ফয়েজী প্রথম আলোকে জানান, শুরা কমিটির সভায় আনাস মাদানীকে অব্যাহতির ঘোষণা দেওয়া হয়। আনাস হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক। এরপর গতকাল দ্বিতীয় দিন আবার বিক্ষোভ হয়।

ছাত্রদের বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনে মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ থেকে শর্ত ভঙ্গ করায় এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়। তাতে বলা হয়, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত মাদ্রাসাটি বন্ধ থাকবে।
আনাস মাদানীকে অপসারণসহ ছয় দফা দাবিতে বৃহস্পতিবারও সেখানে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্ররা। মাদ্রাসায় ১০ জন শিক্ষকের কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। বিক্ষোভকারীরা আনাস মাদানীর অপসারণের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁরা মাদ্রাসার মূল ফটক বন্ধ রেখে ভেতরে বিক্ষোভ করেন। বাইরে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হাসান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি এখন শান্ত। অপ্রীতিকর যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।