সিলেটে ছাত্রদলে পদ পেতে জালিয়াতি, বাবা-মা’র নাম বদল!

18

অতিথি প্রতিবেদক :: প্রতারণা, জাল সার্টিফিকেট ও বিবাহিতদের দিয়ে গঠন করা হয়েছে সিলেট জেলা ছাত্রদলের বেশ কয়েকটি ইউনিট কমিটি। সবচেয়ে বড় প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে সিলেট সদর উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটি গঠনে। আহবায়কের নাগরিক সনদ ও একাডেমিক সার্টিফিকেটের সাথে নাম, বাবা-মা কারোর কোন মিল পাওয়া যায়নি। কমিটি গঠনের ১৫ দিন পার হলেও ক্ষোভ থামছে না সিলেটে। আর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল বলছে, জালিয়াতির ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে গত ৮ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা ছাত্রদলের আওতাধীন ৩২টি ইউনিট কমিটি অনুমোদন দেয় জেলা ছাত্রদল। যদিও কমিটিগুলো প্রকাশ পায় ৯ সেপ্টেম্বর। এর একদিন পর জকিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। কমিটি প্রকাশের পরদিন অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর গোলাপগঞ্জ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাদের বক্তব্য, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ফাহিম চৌধুরী ৮ শ্রেণী পাশ করেছেন। জাল সার্টিফিকেটের মাধ্যমে জেলা ছাত্রদল তাকে পদায়ন করেছে। এছাড়া যুগ্ম আহবায়ক আব্দুর রহমানও লেখাপড়া করেছেন মাত্র ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত। জেলা ছাত্রদল প্রেরিত সাংগঠনিক টিমের কাছে তাদের দুজন কোন একাডেমিক সনদ জমা দেননি। আরেক যুগ্ম আহবায়ক মিজানুর রহমান সুজন বিবাহিত লোক। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এসব অভিযোগ উল্লেখ করে উপজেলা ছাত্রদলের জাহেদ আহমদ, দিদারুল ইসলাম, দুলাল আহমদ ও মাজহারুল ইসলাম সাক্ষরিত একটি চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের কাছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক, ৮ জন যুগ্ম আহবায়ক ও ২ জন সদস্য মিলে কমিটির ১২ জন নেতা একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। অভিযোগে বলা হয়, কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মতিউর রহমান মুমিন ওই কলেজের কোন ছাত্র নয়। কলেজের অধ্যক্ষ সাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি প্রত্যায়নপত্রও সংযুক্তি আকারে জমা দেয়া হয়েছে ঢাকায়।

গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার উপজেলার সাংগঠনিক টিমের প্রধান জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি মাসরুর রাসেল বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিধি সভা করে ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মতানুসারে আমরা উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছিলাম জাহেদ আহমদ মান্না-কে। আমাদের প্রস্তাবিত কমিটিকে পাশ কাটিয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আলতাফ হোসেন সুমন ও ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন নাদিম তাদের পছন্দের লোকদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছেন। ক্ষোভের সহিত তিনি বলেন, তৃণমূলের মতামতকে প্রাদান্য না দিয়ে সিলেট ছাত্রদলকে ধ্বংস করা হয়েছে। এমন অভিযোগ ছাত্রদলের আরও বেশ কয়েকজন সাংগঠনিক টিমের নেতাদের। তাদের বক্তব্য, সিলেটের কোথাও টিমের প্রাস্তাবিতদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়নি।

সবচেয়ে বড় প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে সিলেট সদর উপজেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠনে। আহবায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির অত্যন্ত ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত আবু সাঈদ মো. শাহিনকে। কিন্তু এতে ভয়ঙ্কর প্রতারণা ও জালয়াতির প্রমাণ পেয়েছে। সদর উপজেলার খাদিমনগরের উমাদপাড়া গ্রামের ভোটার তালিকায় সিরিয়াল ৯৭ নাম্বার এ দেখা গেছে আবু সাঈদ শাহিনের নাম। তালিকায় শাহিনের পিতার নাম মো. আব্দুল হাসিম ও মাতার নাম মোছা. নেহার বেগম রয়েছে। এছাড়া পেশা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বেসরকারি চাকরিজীবী ও জন্ম তারিখ ১৫/১০/ ১৯৮৯। কিন্তু সদর উপজেলা ছাত্রদলের কমিটিতে তার নাম এসেছে মো. শাহিন আহমদ হিসেবে। এবং ছাত্রদলের নেতাদের কাছে শাহিনের দেয়া সার্টিফিকেটে দেখা গেছে, তার নাম মো. শাহিন আহমদ, পিতার নাম আকবর আলী ও মাতার নাম ফাতেমা বেগম। এসএসসি পাশ করেছেন ২০০৫ সালে। ভোটার আইডি ও স্কুলের সনদের সাথে নিজের নাম, মা-বাবা কারোর সাথে কোন মিল নেই। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলার সভাপতি সুমন নিজের লোকদের কমিটিতে পদায়িত করতে এসব জালিয়াতিতে জড়িত। এমন ঘটনায় সিলেট-১ আসনে বিগত জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে সমালোচিত করা হয়েছে। এজন্য খাদিমপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বেশ কয়েকদিন মিছিল সমাবেশ করেছে।

এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে শাহিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার সকল কিছু যাচাই-বাছাই করে দল আমাকে আহবায়কের দায়িত্ব দিয়েছে। ভোটার আইডি ও সার্টিফিকেটে নাম ও মা-বাবার নামের মিল নেই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আমি অসুস্থ। এসব বিষয়ে কথা বলতে পারবো না।

আর জেলা ছাত্রদলের সভাপতির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান।

ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও সিলেট বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ওমর ফারুক কাওছার বলেন, সদর উপজেলার আহবায়ক আমাদের কাছে যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছনে এতে তার নাম মো. শাহিন আহমদ রয়েছে। কমিটি দেয়ার পর আমরা জেনেছি সে সবকিছু জালিয়াতি করেছে। তিনি বলেন, মানুষ পদের জন্য যে নিজের মা-বাবার নাম বদলাতে পারে এটা বড় দুঃখজনক। ছাত্রদল নেতা কাওছার বলেন, আমরা এ ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।

 

সবুজ সিলেট/ ২৪ সেপ্টেম্বর/ এহিয়া আহমদ