রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, জিয়া সবার ভাস্কর্য আছে বাংলাদেশে

25

সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে দেশে সম্প্রতি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবিকারী হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক প্রকাশ্যে এই বিতর্ক উস্কে দেওয়ার পর সংগঠনটির নবনির্বাচিত আমির জুনায়েদ বাবুনগরীও শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের এক সমাবেশে ভাস্কর্য-বিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এর ঢেউ এখন সংক্রমিত করছে অন্য ইসলামি দলগুলোকেও। এর বিপরীতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকারের ছাত্র ও যুব অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোসহ বাম ও প্রগতিশীল ধর্মভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন। তবে এই বিতর্ক ওঠায় সঙ্গতকারণে প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যই কি দেশে প্রথম? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ভাস্কর্য নির্মাণের আছে দীর্ঘ ইতিহাস। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি নির্ভর ভাস্কর্যগুলোর সংখ্যাও কম নয়।

২০০৮ সালের পর থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ভাস্কর্য তৈরি বেড়ে গেছে। তবে আগেই ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের। তারও অনেক আগে এই বাংলার গর্ব মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ আরও অনেকের ভাস্কর্য রয়েছে এই বাংলায়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম পুরনো ভাস্কর্যটি রয়েছে বগুড়ায়। ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের এই আবক্ষ ভাস্কর্যটি ১৯০১ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকে অমলিন করে রাখতে কবির দুটো ভাস্কর্য করা হয়েছে নওগাঁয়। এছাড়াও কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে। আছে শাহজাদপুরে আরেকটি ভাস্কর্য।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মুর‌্যাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেলেও তার ভাস্কর্য দুর্লভ। বাংলা একাডেমির বটতলায় কবির একটি আবক্ষ ভাস্কর্য ২০০২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় স্থাপন করা হয়।

ধর্মীয় সংগঠনগুলো জাতির পিতার ভাস্কর্য নির্মাণে বাধা দিলেও দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্যও আছে। দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের আগেই জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জিয়াউর রহমানের একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।

এছাড়াও ২০০১-২০০৫ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় খাগড়াছড়ি শহরের মুসলিমপাড়া মোড়ে জিয়াউর রহমানের আরেকটি ভাস্কর্য স্থাপন করেন বিএনপির তদানীন্তন স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়া। জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই ভাস্কর্যে পুস্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে। প্রশাসনের সহাবস্থান নীতির কারণে এ শহরে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি জিয়ার ভাস্কর্যটিও অক্ষত আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে নতুন করে আপত্তি ও বিতর্ক তুললেও দেশের স্বাধীনতার স্থপতির পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য ২০১০ সাল থেকেই বিভিন্ন জেলায় নির্মিত হয়ে আসছে। গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের একাডেমিক ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য উদ্বোধন হয় ২০১০ সালের ১৬ মার্চ। সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের চাঁদা দিয়ে নির্মিত এই ভাস্কর্যটিতে আছে শিক্ষার্থীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে সম্মাননা জানাতে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উন্মোচন করে বরিশাল প্রেসক্লাব। বরিশাল বিভাগে প্রথম বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাস্কর্য স্থাপিত হয় এই প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে। প্রায় ১০ ফুট উঁচু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি তার ৭ মার্চের ভাষণের আদলে নির্মিত।

বঙ্গবন্ধু যত ভাস্কর্য দেখা যায় তার মধ্যে রেসকোর্স ময়দানে তার দেওয়া ৭ই মার্চের ভাষণটিকে মূর্ত করে তোলার চেষ্টা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। রাঙামাটিতেও এমন একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। ২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভাস্কর্যটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ইত্যাদি এলাকায়। রংপুর ও নরসিংদীতেও বঙ্গবন্ধুর আরও দুটো ভাস্কর্য নির্মীয়মাণ আছে। এই মহান নেতার ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে আরও অনেক শহরের বিভিন্ন সড়কের চত্বর, পার্ক ইত্যাদি খোলা জায়গায়।

জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম. মুনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানের নিজস্ব শহরগুলোতে তাদের বিশাল প্রতিকৃতি, মুর‌্যাল ইত্যাদি থাকলেও ভাস্কর্য নেই। তবে নিজ শহরে না হলেও নারায়ণগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে তাদের বঙ্গবন্ধু পরিবেষ্টিত ভাস্কর্য।

এছাড়াও কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়াতে আছে মরমি সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের, যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ী গ্রামে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের একাধিক আবক্ষ ও একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য রয়েছে। বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে তার জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতির জায়গা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবের (বর্তমান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয়) সামনে স্থাপন করা হয়েছে এই বিপ্লবীর একটি ভাস্কর্য।

প্রখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান বলেন, সবদেশেই ভাস্কর্য আছে। আরবের পবিত্রভূমিতে প্রচুর ভাস্কর্য আছে। ভাস্কর্যকে শিল্পমনা হিসেবেই দেখতে হবে। একজন সাহিত্যিক সাহিত্য রচনা করেন, চিত্রকর ছবি আঁকেন, ভাস্কর ভাস্কর্য তৈরি করেন। বিষয়টাকে এভাবে দেখলেই কিন্তু সহজ হবে। ভাস্কর্যও কিন্তু মনের ভাব প্রকাশের একটা মাধ্যম, যেটি শিল্প আকারে আসছে। এটি আমাদের দেশে আমরা নতুন করছি তা নয়, সব দেশই করছে। আমরা একজনের প্রতিকৃতি রাখি তাকে সম্মান জানানোর জন্যই, এটাকে ওভাবেই নিতে হবে।

যাকে সম্মান করি আমরা তাকে আমাদের মাঝে অনেক দিন ধরে রাখার প্রয়াস হিসেবেই ভাস্কর্য তৈরি করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবেই চিন্তা করলে বিষয়গুলো সহজ হয়, বিতর্ক আর হয় না। আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই, আমরা দেখবো যে মুসলিম শিল্পের প্রকাশ কিন্তু একটা পৃথিবীতে আছে। আছে বলেই এখনও মসজিদগুলো অনেক সমাদৃত। তাজমহল বিখ্যাত কারণ এর মধ্যে অনেক শিল্প আছে, এটি তো মুসলমানদের করা। কুতুব মিনার কিন্তু মুসলমানেরই কীর্তি। এগুলো কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আছে এবং পৃথিবীর আশ্চর্যমূলক বস্তুর জায়গায় স্থান পেয়েছে। শিল্প হিসেবেই এগুলোকে দেখলে কিন্তু বিষয়টা অনেক সুন্দর হয়।

 

সবুজ সিলেট/ এস মায়াজ আহমদ তালহা

  •