ভাস্কর্য ইস্যুতে জাতীয় পার্টির মুখে কুলুপ

4

সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
ভাস্কর্য স্থাপনকে ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করেছে ইসলামী দলগুলোসহ দেশের আলেম-ওলামাদের একাংশ। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতাকে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বাম দলগুলো। প্রগতিশীল গোষ্ঠীও ভাস্কর্য বিরোধিতায় যুক্তদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে গত কিছুদিন ধরে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা চললেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটেছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)।

দলের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতাকে কোনো ইস্যুই মনে করছে না জাতীয় পার্টি। দলটি বলছে, দেশে এখন অনেক সমস্যা আছে, সেগুলোর সমাধান জরুরি। বর্তমানে ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতেও চান না তারা। তারপরও আগামী সপ্তাহে পার্টির প্রেসিডিয়াম বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে, ভাস্কর্য ইস্যুতে জাতীয় পার্টির ‘আনুষ্ঠানিক’ অবস্থান কী হবে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছে, বরাবরই ‘ধর্মাশ্রয়ী বলয়ে আবদ্ধ’ জাতীয় পার্টির এমন আচরণ নতুন নয়। বরং ধর্মীয় কোনো ইস্যুতে তারা এমন আচরণই করে থাকে। আর দলের একাধিক নেতার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে— আগামী নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে জাতীয় পার্টির। ফলে তারা সরাসরি ইসলামি দলগুলোর অবস্থানের বিপক্ষে মুখ নাও খুলতে পারেন।

ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে জানতে চাইলে পার্টির একাধিক নেতাকর্মী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন ইস্যুতে জাতীয় পার্টি নীরব ভূমিকা পালন করছে। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির পদক্ষেপ হবে কৌশলী। কারণ আগামী নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে নির্বাচনি জোট করার পরিকল্পনা করেছে। এই ইস্যুতে জাতীয় পার্টি কৌশলী না হলে সব হারাবে।

দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও বলেন, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষাণা কেরেছিলেন। ফলে ধর্ম ইস্যুতে জাতীয় পার্টি ভেবেচিন্তেই পদক্ষেপ নেবে।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে যে ইস্যু তৈরি হয়েছে, এটি কোনো ইস্যুই নয়। দেশের জনগণ অনেক সমস্যার মধ্যে রয়েছে। জাতীয় পার্টি জনগণের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণের এসব সমস্যা নিয়ে সবসময় সরব থাকবে জাতীয় পার্টি।

এ বিষয়ে পার্টির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা। তিনি সবার ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্করর্য স্থাপনের ইস্যুতে জাতীয় পার্টির নীরব— এরকম বলার কিছু নেই। আগামী সপ্তাহে পার্টির প্রেসিডিয়াম সভা হবে। সেখানে এ বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য বাবলা ভাস্কর্য ইস্যুতে ইসলামি দলগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি এই ইস্যুতে আমার নির্বাচনি আগামী শনিবার (৫ ডিসেম্বর) মানবন্ধন করব। আমার দল আছে ঠিকই। তবে আমি এই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতের বাইরে যাব না। বঙ্গবন্ধু ওআইসি সম্মেলন গেছেন, ইসলামী ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন। আর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করেছেন। তাই তৌহিদী জনতা আমরা।

ধর্মীয় স্পর্শকাতর ইস্যুতে জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন অনেক পুরনো। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের দিনেও জাতীয় পার্টি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা হেফাজত কর্মীদের জন্য খাবার বিতরণ করে। সেদিন জাতীয় পার্টির ভূমিকার সঙ্গে এখনকার ইসলামি দলগুলোর ভাস্কর্য বিরোধিতা ইস্যুতে জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে এক করে দেখছেন অনেকেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, জাতীয় পার্টি বরাবরই একটি আদর্শহীন দল। তাদের সব কর্মকাণ্ডই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এখনো তারা যা কিছু করছে, যা কিছু বলছে, সবই ক্ষমতার তোষণ নীতিতে কেন্দ্র করে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পার্টি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে এর আগেও কিছু বলেনি, এখনো বলছে না। তাদের এই আচরণে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ তারা বরাবরই হাওয়া বুঝে পাল তোলে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতেও তারা আসলে একইরকম আদর্শহীন আচরণই করছে।

ভাস্কর্য ইস্যুতে অবশ্য সরকারেরও দায় দেখছেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, সরকার সাপের মুখেও চুমু খাচ্ছে, ব্যাঙের মুখেও চুমু খাচ্ছে। সরকারের দ্বিচারী আচরণের কারণেই আজকে মৌলবাদী শক্তি সাহস পেয়েছে। সে কারণেই তারা আজ জাতির জনকের ভাস্কর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পাচ্ছে। তাই এই ইস্যুতে সরকারকেও দায় নিতে হবে।

সবুজ সিলেট/ এস মায়াজ আহমদ তালহা

  •