মাইক্রোগ্রিন মেটাবে সবুজের চাহিদা, আয়ের হাতছানিও আছে

17

সবুজ সিলেট ডেস্ক::
আবাদি জমি খালি না রাখা ও শহুরে কৃষিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে। আর এই যাত্রাকে অবারিত করতে বসে নেই কৃষি প্রযুক্তিও। নিত্যনতুন ধারণায় স্মার্ট হচ্ছে চাষবাস। তেমনি এক স্মার্ট কৃষির নাম মাইক্রোগ্রিন। দেখতে সাধারণ হলেও এর মাধ্যমেই কিন্তু শহরের সৌখিন চাষীরা পূরণ করে নিতে পারেন তাদের পরিবারের প্রতিদিনকার সবুজ খাবার ও ভিটামিনের চাহিদা। এমনকি এর জন্য নিজের বাড়ির ছাদ বা সরাসরি সূর্যের আলো না হলেও চলবে। দরকার শুধু এক চিলতে বারান্দা।

মাইক্রোগ্রিন কী?

মাইক্রো মানে ছোট আর গ্রিন বলতে এখানে গাছ বোঝানো হচ্ছে। মূলত ট্রে ভর্তি চারাগাছই হলো মাইক্রোগ্রিন। আর এই চারাগাছ এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ বয়সেই কাঁচা খেতে হয়। মাইক্রোগ্রিন চাষের উদ্দেশ্য কিন্তু ভরপেট খাওয়া নয়, ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা। কেননা, সাধারণ সবজিতে যে পরিমাণ পুষ্টি পাওয়া যায়, মাইক্রোগ্রিনে তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া যায়। কারো কারো মতে এ পুষ্টির পরিমাণ ৪ গুণ বেশি! পাশাপাশি এটি খাবারের স্বাদেও যোগ করে নতুনত্ব। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে এটি বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা কেজিতে।

মাইক্রোগ্রিনের জন্য বিশেষায়িত প্লাস্টিকের ট্রে পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক কিছু অনলাইন বাজারে। তবে যেকোনও টব, ট্রে বা অন্য পাত্রেও চাইলে এটার চাষ করা সম্ভব। ধানের বীজতলার জন্য যেমন অল্প জায়গার প্রয়োজন হয়, তেমনি একটি পরিবারের জন্য মাইক্রোগ্রিন ফলাতে ছোট এক চিলতে বারান্দাই যথেষ্ট। এর বাইরে বীজের অঙ্কুরোদগম ও পরিচর্যা নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা করতে হবে। এ কাজে আছে ইউটিউব। ‘হাউ টু গ্রো মাইক্রোগ্রিন’ লিখে সার্চ করলেই মিলবে শত শত টিউটোরিয়াল ভিডিও।

‘আমাদের দেশে মাইক্রোগ্রিন নিয়ে খুব বেশি প্রচারণা না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো এটাকে ব্যয়বহুল মনে করা। তবে, রাজধানীতে যারা শখের চাষী তাদের অনেকেই জানালেন, বীজ কেনা ছাড়া মাইক্রোগ্রিনে খরচ বলতে আর কিছু নেই। আর সেই বীজের দাম সৌখিন চাষীদের জন্য আহামরী কিছু নয়। বরং এটা শহুরে শিশুদের জন্য এটি হতে পারে দারুণ এক সবুজ-বিনোদন। বীজ থেকে ট্রেতে ছোট ছোট চারাগাছ গজিয়ে উঠতে দেখে তারাও দেখা যাবে কৃষিতে আগ্রহী হচ্ছে।’ জানালেন রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা নূসরাত জাহান। শখ করে মাঝে মাঝেই ট্রেতে মাটির স্তর দিয়ে তিনি চাষ করেন মাইক্রোগ্রিন।

অঙ্কুরোদগমের ৭-১৪ দিনের মধ্যেই খাওয়া যায় মাইক্রোগ্রিন

সংক্ষেপে মাইক্রোগ্রিন চাষ পদ্ধতি

সব সবজির মাইক্রোগ্রিন হয় না। মূলত যেসব সবজি বা শাক একদম চারা অবস্থায় কাঁচা খাওয়া যায় সেসবের বীজই এ কাজে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে চাষীদের পছন্দের তালিকায় আছে সরিষা, মুলা, লেটুস, বাধাকপি, লাল শাক, গাজর, সূর্যমুখী, মেথি, বিটরুট, ব্রকোলি, মটরশুঁটি, শালগম ইত্যাদি। এগুলোর বীজ নিয়ে একটি ট্রেতে বীজতলার মতো করে একগাদা খুদে চারা তৈরি করাই হলো কাজ। এর জন্য জানতে হবে কোন বীজ কতদিনে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অঙ্কুরিত হয়। যেমন সূর্যমুখী বা মুলার বীজকে এক রাত ভিজিয়ে রাখলে অঙ্কুরিত হয় দ্রুত। ছোট বীজগুলোকে সাবধানে ভেজানো মাটিতে ছিটিয়ে দিতে হয়।

একটি ট্রেতে দুই ইঞ্চির মতো মাটির স্তর করে সেটাকে ভালো করে ভিজিয়ে (পানি যেন না জমে) তাতে বীজ ছিটিয়ে দিতে হয় প্রথমে। তারপর তাতে মাটির আরেকটি স্তর দিয়ে বীজগুলোকে ঢেকে রেখে দেওয়া যাবে যেকোনো জায়গায়। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার আগে আলোর প্রয়োজন হয় না। তবে অঙ্কুরিত হওয়ার পর ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হয়। এ সময় ট্রের আর্দ্রতা বজায় রাখতে ওটাকে প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে রাখা যায়।

সাধারণত অঙ্কুরিত হওয়ার এক সপ্তাহ বা থেকে বিশ দিনের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগী হয় মাইক্রোগ্রিন। মূলত চারায় যখন দুটি করে পাতা গজায় তখনই ওটা মাইক্রোগ্রিন। কিছু সবজি আছে এর চেয়ে বড় হলে আর কাঁচা খাওয়া যায় না।

কয়েকটি ট্রেতে কয়েক ধরনের মাইক্রোগ্রিন একসঙ্গে চাষ শুরু করলে কিছু দিন পরপরই এটি আহরণ করতে পারবেন। আবার নির্দিষ্ট মেয়াদে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হবে ট্রে। চারাগুলোর গোড়া থেকে কাচি দিয়ে কেটে সরাসরি ছড়িয়ে দিতে পারেন সালাদের বাটিতে।

চারাগাছে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। মাইক্রোগ্রিনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ট্রেতে পানি দেওয়া যায় নিচ দিয়ে। সরাসরি উপর থেকে পানি দেওয়া হলে তাতে বীজ সরে গিয়ে অঙ্কুরোদগম না-ও হতে পারে। এক্ষেত্রে স্প্রে করে পানি দেওয়াটাই সবচেয়ে কার্যকর।

মাইক্রোগ্রিন তৈরির জন্য বীজ সংগ্রহ করাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে খুচরা যেসব প্যাকেটজাত বীজ তৈরি হয় তাতে মাইক্রোগ্রিন ফলাতে গেলে বেশ খরচা পড়বে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে যারা এটি চাষ করতে চান তারা কমমূল্যে বেশি করে খোলা বীজ কিনে নিতে পারেন। বিশেষ করে লেটুস বা বাধাকপির মতো দামি মাইক্রোগ্রিম ফলাতে গেলে বীজের পাইকারি বাজারে যাওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনা
ভারতে মাইক্রোগ্রিন জগতে চেনা নামটা হলো তামিলনাড়ুর বিদ্যাধরন। ছোট্ট একটি ঘরে মাইক্রোগ্রিন চাষ করে যার মাসিক আয় লাখ রুপির কাছাকাছি। তার বড় ক্রেতা হলো বড় বড় রেস্তরাঁ। বড় হোটেলগুলোর শেফরাও তার কাছ থেকে নিয়মিত নিয়ে যাচ্ছে মাইক্রোগ্রিন।

ইউরোপের পেশাদার মাইক্রোগ্রিন চাষীরাও বেশ ভালো অংকের আয় করছেন। আমাদের দেশে এর বাজার অতটা না থাকলেও কিছু বড় বড় হোটেলে এর চাহিদা আছে। তবে বাণিজ্যিক আকারে বড় পরিসরে এর চাষ করতে দরকার হবে আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ জানিয়েছেন, ‘কৃষিতে এটি নতুন। শহরের সৌখিন চাষীদের কাছে এটি সমাদৃত। তবে কিছুটা ব্যয়বহুল। এর জন্য ট্রে জাতীয় উৎপাদন সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যা বেশ দামী। কোনও প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে শুধু মাটি বা কেঁচো সার ব্যবহার করেও এ পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করতে হয়। কম জায়গায় কম উৎপাদন হয় বলে বাজারের অন্য সবজির তুলনায় এর দামও হবে বেশি। রফতানিতে এর চাহিদা রয়েছে। তবে দেশে যে পরিমাণ মাইক্রোগ্রিন তৈরি হচ্ছে তা রফতানির পর্যায়ে যায়নি। তবে একটি পরিবারের দৈনিক সবজির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব এই পদ্ধতিতে।’

তিনি আরও জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। শহরের মানুষেরা শখের বসে এটি করেন বলে তাদের এ নিয়ে কোনও প্রণোদনা বা সহায়তার চাহিদা নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এফবিসিসিআই-এর সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘আমাদের রফতানি বাণিজ্যে যেসব পণ্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে তার মধ্যে এটি একটি। বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মাইক্রোগ্রিন উৎপাদন শুরু করলে সেটি অসম্ভব কিছু নয়। বিভিন্ন দেশে এই সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কারণ, এটি যাবতীয় রাসায়নিক সারমুক্ত ও সাধারণ সবজির চেয়ে বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, ‘মাইক্রোগ্রিন সম্ভাবনাময় খাত। বিশ্ববাজারেও চাহিদা ব্যাপক। কেউ যদি বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এটি উৎপাদনে উৎসাহী হয় সরকার অবশ্যই সহযাগিতা করবে।’

সবুজ সিলেট/০৬ডিসেম্বর/শামছুন নাহার রিমু