বিয়ে করতে গিয়ে খুন, ৩ বছর পর গ্রেপ্তার প্রেমিকা

27

সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
কুষ্টিয়ার গরু ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম নিহত হওয়ার তিন বছর পর তার খুনের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন শহিদুল ইসলাম। এই ঘটনায় শহিদুলের মা তমিরুন নেসা কুষ্টিয়ার আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলায় শহিদুলের মৃত শ্যালক মোতাহারের স্ত্রী রোজিনা বেগম, তার বাবা জব্বার শেখ ও মা মতিরন নেসাকে আসামি করা হয়। আদালত প্রাথমিক পর্যায়ে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন পিবিআইকে। পিবিআইয়ের তদন্তে বিষয়টির সত্যতা মিললে পরে থানা পুলিশকে নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পুলিশ সদর দপ্তর ২০১৯ সালের নভেম্বরে অপহরণ মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।

মঙ্গলবার দুপুরে মালিবাগ সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, অপহরণ মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ২২ নভেম্বর কুমারখালী থেকে রোজিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোজিনা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার কথা স্বীকার করেন।

মামলার সূত্র উল্লেখ করে নাজমুল আলম বলেন, নিহত শহিদুলের শ্যালক মোতাহেরের সঙ্গে রোজিনা বেগমের বিয়ে হয়। কিন্তু মোতাহেরের বসবাস উপযোগী ঘর না থাকায় তিনি স্ত্রীকে নিয়ে দুলাভাই শহিদুলের বাড়িতে ওঠেন। এসময় শ্যালকের স্ত্রীর প্রেমে পড়েন শহিদুল।

বিষয়টি জানাজানি হলে মোতাহার তার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা বাড়ি করে সেখানে থাকা শুরু করেন। তবে কয়েক বছর পর মোতাহার মারা যান। এর মধ্যে শহিদুলের স্ত্রীরও মৃত্যু হয়।

শ্যালকের মৃত্যুর পর তাদের পরকীয়া প্রেম আরও গতিপায়। কিন্তু শহীদুলের আর্থিক অনটন ও তিনি বিবাহিত হওয়ায় এক পর্যায়ে রোজিনা শহীদুলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে কুষ্টিয়া থেকে মানিকগঞ্জ চলে যান। এখানে আকিজ টেক্সাটাইলে কাজের সুবাদে সুপারভাইজার মোমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা বিয়েও করেন। যদিও এ সময় মোমিনও বিবাহিত ছিলেন। তার দুটি সন্তানও ছিল।

মোমিন রোজিনাকে বিয়ে করার কারণে তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। মোমিনের সঙ্গে রোজিনার বিয়ে হওয়ার কারণে শহীদুলের সঙ্গে আগের ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও যোগাযোগ ছিল। এ সুযোগে শহীদুল এলাকায় রোজিনাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার কথা প্রচার করেন। এমনকি মোমিনের সঙ্গে বিয়ের পরেও শহীদুল বিভিন্ন সময়ে রোজিনাকে ফোন করতেন। এতে মোমিন ও রোজিনার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু হয়।

এরমধ্যে মোমিনুল ও রোজিনা মিলে শহীদুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রোজিনা শহিদুলকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি তাকে বিয়ে করবেন। ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাতে বিয়ের কথা বলে শহিদুলকে শ্রীপুরে নিয়ে যান। শ্রীপুরের লাঙ্গলবাদ বাজারে শহিদুলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন রোজিনা ও মোমিন। তারা দুজন শহিদুলকে একটি খোলা মাঠ দিয়ে নিয়ে যান। রাতের অন্ধকারে দূরের আলো দেখিয়ে রোজিনা শহিদুলকে বলেন, ওই বাত্বিজ্বলা বাড়িটি আমার বান্ধবীর, সেখানে যাবো। মাঠের কিছুদূর যাওয়ার পর রোজিনা ও মোমিন শহিদুল জাপটে ধরেন। প্রায় আধাঘন্টা তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এরপর শহিদুল ক্লান্ত হয়ে গেলে রোজিনা তার বুকের ওপরে ওঠে বসে দুইহাত চেপে ধরে। মোমেন চাকু দিয়ে গলায় একাধিক বার ছুরিকাঘাত করে। তবে চাকুতে ধার না থাকায় প্রথমে শহিদুলের গলা কাটেনি। পরে চাকুর সরু মাথা দিয়ে মোমিন গুতাতে থাকে। এরপর শহিদুল নিস্তেজ হয়ে পড়েণ। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার হাত পায়ের রগ কেটে দেন মোমিন। এরপর সেখানে লাশ রেখে তারা মোমিনের বাড়িতে যান।

এদিকে ধস্তাধস্তির সময় চাকুর আঘাতে মোমিন ও রোজিনার হাতও কেটে যায়। তারা বাড়িতে গিয়ে জানায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে তাদের হাত কেটেছে।

ঘটনার পর দিন শ্রীপুর থানার পুলিশ অজ্ঞাত হিসেবে শহিদুলের লাশ উদ্ধার করে। ধারণা করা হয়েছিল চরমপন্থিরা তাকে হত্যা করেছে। একটি হত্যা মামলা হলেও থানা পুলিশ তদন্তের কোনো কুলকিনার করতে না পারায় হত্যা মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। লাশ অজ্ঞাত হিসেবেই থেকে যায়। কারণ ওই এলাকায় শহিদুলকে কেউ চিনতে পারেনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুজিৎ ঘোষ বলেন, আমি অপহরণ মামলা তদন্ত করতে গিয়ে প্রথমে শহিদুলের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল তা শনাক্তের চেষ্টা করি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সর্বশেষ অবস্থান ছিল মাগুরার শ্রীপুরের লাঙ্গলবাদ বাজারে। রোজিনার ব্যবহৃত সিমটিও একই এলাকায় ছিল। এরপর আমরা রোজিনাকে ঢাকার আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তিনি সব স্বীকার করলে মোমিনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

রোজিনার দেয়া স্বীকারোক্তির পর সিআইডি মাগুরার শ্রীপুর থানায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঠিকই রোজিনার বক্তব্য অনুযায়ী ওই এলাকা থেকে একজনের লাশ উদ্ধার হয়। যাকে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। হত্যা মামলা হলেও সেটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম বলেন, আমরা অপহরণ মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পেরেছি শহিদুলকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা হত্যা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করবো।

সবুজ সিলেট/ এস মায়াজ আহমদ তালহা

  •