ফাতেমাকে গলা টিপে হত্যা করে ইউনুস

9

সবুজ সিলেট ডেস্ক
ফাতেমা ও ইউনুস
সম্পর্কটা পরিবার মানছিল না, ওদিকে পেটে সন্তান আসায় বিয়ের চাপ দিচ্ছিলেন ফাতেমা। তাই দায় এড়াতে ফাতেমাকেই ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার পরিকল্পনা করে ইউনুস। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফাতেমাকে ভালোবাসা দেখাতে দিনভর ঘোরাঘুরি করে রাতে দু’বার শারীরিক মিলনেও জড়ায় ইউনুস। ফাতেমা যখন বিশ্বাসের দোলায় দুলে প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখনই আচমকা তার গলা টিপে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়ে লাশ লুকিয়ে ফেলে ইউনুস। তবে পুলিশ শুরুতে এই হত্যা মামলার কোনও ক্ল উদ্ধার করতে পারেনি। মামলাটি হাতে পেয়ে মাত্র ৪৩ দিনে রহস্য উদ্ধার ও খুনিকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিবিআই জানিয়েছে, ক্লুলেস ফাতেমা হত্যার প্রধান আসামি ইউনুস আলীকে (২৫) সিলেটের জৈন্তাপুর বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামি হত্যার বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন।

শনিবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সাইনবোর্ড একাকায় অবস্থিত পিবিআইয়ের নারায়ণগঞ্জ অফিসের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

পুলিশ সুপার জানান, নিহত ফাতেমা বেগম ও ইউনুস আলী আড়াইহাজারের গোপালদী মানিকনগর এলাকায় পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করতো। মালোশিয়া ফেরত ইউনুস আলীর সঙ্গে তালাকপ্রাপ্তা ফাতেমা বেগম প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এই সম্পর্ক খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়। এরইমধ্যে ইউনুস আলী নতুন বাড়ি করে এক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। পুরাতন বাড়ি ফাঁকা থাকায় সেখানে তাদের সাক্ষাৎ হতো। পাঁচ মাস পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ফাতেমা বেগম। এরপর তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। এদিকে, ইউনুসের পরিবার বিষয়টি জেনে যায় এবং ডিভোর্সি ফাতেমাকে পুত্রবধূ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা ইউনুসকে অন্যত্র বিয়ে করানোর জন্য মেয়ে দেখছিল। পরিবার নিতে না চাইলেও ফাতেমা ইউনুসকে বিয়ের ব্যাপারে চাপ দিতেই থাকে। তখন ফাতেমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে ইউনুস। গত ১০ আগস্ট ইউনুস আলী তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ফাতেমা বেগমকে মোবাইল ফোনে বাসা থেকে ডেকে আনে। তাকে নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সন্ধ্যায় তার নতুন বাড়ির পেছনে জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে ফাতেমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে। পরে ফাতেমাকে সেখানে রেখে ইউনুস বাসায় চলে যায়। রাত ১০টার দিকে ইউনুসের পরিবারের সদস্যরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সে আবার ওই জঙ্গলে আসে ফাতেমার সাথে দেখা করার জন্য। ওই সময় সে আবার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে। এ অবস্থাতেই ফাতেমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর ফাতেমার লাশ জনৈক ডালিমের নির্মাণাধীন ঘরের বালু ভর্তি ভিতের (ভিটি) নিচে কোদাল দিয়ে গর্ত করে বালু চাপা দিয়ে চলে যায়। দুইদিন পর এই ইউনুস আলী ডালিমের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কেন ঘরের মেঝে পাকা করছে না। প্রয়োজনে দ্রুত মেঝে পাকা করার জন্য যদি টাকা পয়সা প্রয়োজন হয় তার কাছ থেকে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এদিকে নিখোঁজ ফাতেমার সন্ধানে চারদিকে ছুটে বেড়ায় তার পরিবার।

ফাতেমা হত্যার রহস্যজট উন্মোচনের পর পিবিআইয়ের নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

এরপর মাটি চাপা দেওয়ার ছয়দিন পর লাশ পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলে বাড়ির লোকজন ঘরের বালু সরিয়ে লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় গোপাদলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই মুক্তার হোসেন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গত ২৯ অক্টোবর মামলাটি পিবিআইতে আসে। মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে আসার মাত্র ৪৩ দিনের মাথায় রহস্য উন্মোচন ও আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যববহার করে পিবিআই আসামি ইউনুস আলীকে শনাক্ত করে। এরপর সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গ্রেফতার করে।

তিনি আরও জানান, আসামি এ হত্যার বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যার আলামত নষ্ট করার জন্য আসামি নিহত ফাতেমা বেগমের মোবাইল সেট, জাতীয় পরিচয়পত্র, গলার হার, কানের দুল, হাত ব্যাগ, ওড়না গোপালদী বাজারের গাজীপুরা ব্রিজ থেকে হাড়দোয়া নদীতে ফেলে দেয়।

তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে অন্য কারও জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সবুজ সিলেট/১৩ ডিসেম্বর/শামছুন নাহার রিমু