পাথর তুলতে মরিয়া পরিবহন ব্যবসায়ীরা

2

 

সবুজ সিলেট ডেস্ক

পরিবেশগত কারণে সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। উচ্চ আদালত থেকেও এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এমন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাথর উত্তোলনের দাবি জানিয়ে আসছেন পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

সম্প্রতি এই দাবিতে মাঠে নেমেছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। পাথর উত্তোলনে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। সরকারকে নিজেদের দাবি মানাতে বাধ্য করতে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছেন পরিবহন সমিতির নেতারা। সে লক্ষ্যে সিলেটে তিনদিনের পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছেন তারা। আগামী ২২, ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর সিলেট বিভাগে সকল প্রকার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে সিলেট বিভাগীয় ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান মালিক ঐক্য পরিষদ। এতে অন্যান্য পরিবহন সংগঠনও একাত্মতা প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

যদিও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, আবার পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে পাথরখেকোরাই আশকারা পাবে। অনুমতি পেলে তারা পরিবেশ ধ্বংস করে পাথর উত্তোলনে উদ্যোগী হবে।

তবে পরিবহন মালিকরা বলছেন, পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ায় সিলেটের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। পাথর শ্রমিকদের পাশাপাশি পারিবহন মালিক ও শ্রমিকরাও সঙ্কটে পড়েছেন। একারণে পাথর উত্তোলনের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।

আর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবেশ ধ্বংস, শ্রমিক মৃত্যুসহ নানা অনিয়মের কারণেই পাথর উত্তোলন বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।

পরিবহন মালিকদের এই আন্দোলন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাথর আমদানি তো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাছাড়া যখন নিষেধাজ্ঞা ছিলো না তখনও সিলেটের কোয়রিগুলো থেকে সামান্য পরিমাণ পাথরই উত্তোলন হতো। বেশিরভাগই ভারত থেকে আমদানি করা হতো। আমদানি যেহেতু অব্যাহত রয়েছে তাই পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

কিম বলেন, আমার মনে হয় পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতাদের পাথরখেকো চক্রই মাঠে নামিমেছে। এই গোষ্ঠির ইন্ধনেই কাজ করছেন তারা।

তিনি বলেন, অনুমতি পেলে পাথরখেকো গোষ্ঠি ম্যানুয়েলি পাথর তুলবে না। অনুমতি পেলেই তারা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলা শুরু করবে। এখন নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায়ও অনেক জায়গায় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে। তাই কোনো অবস্থায়ই আর পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া যাবে না।

জানা যায়, পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন টিলা, বিছনাকান্দি ও লোভছড়া- এই পাঁচ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়।

এরআগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বেলা)-এর দায়ের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে সব ধরণের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত।

বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন টিলা, জাফলং, লোভছড়াসহ সবগুলো কোয়ারির পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলার অভিযোগ রয়েছে পাথর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।

কেবল পরিবেশ ধ্বংস নয়, ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে মারা গেছেন অনেক শ্রমিকও। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর হিসেবে, সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৬ জন পাথর শ্রমিক নিহত এবং ২১ জন আহত হয়েছেন।

পাথর উত্তোলনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই উত্তোলনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমকিরা। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরাও। বিশেষত সিলেট বিভাগীয় ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান মালিক ঐক্য পরিষদ ও সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপ এই দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট নগরে বিক্ষোভ। সমাবেশ করে তারা। তবে এতে কোনো লাভ না হওয়ায় বৃহস্পতিবার এক বৈঠক থেকে তিনদিনের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান মালিক ঐক্য পরিষদ ও সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সভাপতি গোলাম হাদী ছয়ফুল বলেন, সিলেটে কোনো শিল্প কারখানা নেই। এখানকার ট্রাক কেবল পাথর পরিবহনেই ব্যবহৃত হয়। পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ায় ট্রাক মালিক ও শ্রমিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন।

তিনি বলেন, সিলেটের ট্রাক মালিকদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যংক ঋণ রয়েছে। ট্রাক ভাড়া দিয়ে আয় করেই তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। এখন পাথর পরিবহন বন্ধ হওয়ায় মালিকরা ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পারছেন না। আর পরিবহন খাতের লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় জাফলং ও ভোলাগঞ্জ সড়কে বাস ও অটোরিকশার যাত্রীও কমে গেছে। ফলে তারাও সঙ্কটে পড়েছেন। সবার স্বার্থ বিবেচনায়ই আমরা পাথর উত্তোলনের দাবি জানিয়েছি।

অনুমতি পেলে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই পাথর উত্তোলন করা হবে জানিয়ে গোলাম হাদী ছয়ফুল বলেন, পাথর ব্যবসায়ীদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। তারা কথা দিয়েছেন সরকার অনুমতি দিলে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই তারা পাথর তুলবেন। আর কোনো যন্ত্রের ব্যবহার করবেন না। পরিবেশও ধ্বংস করবেন না। আমরাও বিষয়টি তদারকি করবো।

সিলেটের অন্যতম বৃহৎ পাথর কোয়ারি কোম্পানীগঞ্জে। এই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য বলেন, পাথর উত্তােলনের মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংস, শ্রমিকদের মৃত্যু ও পাথরকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার কারণেই সরকার পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে। আদালত থেকেও এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফের পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে কি না এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়।

সবুজ সিলেট/ ১৮ ডিসেম্বর/ হাসান

  •