সিলেটে পাথর ও বালুখেকো: তালিকায় ২২২ ‘চুনোপুঁটি’ রাঘববোয়ালরা বাদ

7

 

সিলেট নগরীর কদমতলী ফেরীঘাটে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে পাথর ভাঙ্গার কাজ চলছে।ছবি-সবুজ সিলেট

সবুজ সিলেট ডেস্ক

রাঘববোয়ালদের বাদ দিয়ে সিলেট বিভাগের ২২২ জন ‘চুনোপুঁটি’ পাথর ও বালুখেকোর তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। এমনকি যেসব উপজেলা অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের জন্য পরিচিত, সেসব উপজেলার কারও নামও নেই। তালিকায় চিহ্নিত পাথর ও বালুখেকোর নাম না থাকায় সমালোচনামুখর হয়েছেন অনেকে। সিলেট নগরীর ফেরীঘাটসহ দক্ষিণ সুরমা থানা,শাহপরান (রাঃ) থানার বিভিন্ন স্থানে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে পাথর ভাঙ্গার কাজ চলছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের আমরা বিভিন্ন সময়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখিছি। কাজেই পুলিশের তালিকায় মূল অপরাধীদের নাম না আসাই স্বাভাবিক। তারা এই তালিকার মাধ্যমে চিহ্নিত পাথর ও বালুখেকোদের বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছে। পিবিআই অথবা সরকারের অন্য কোনো সংস্থাকে দিয়ে সঠিক তালিকা তৈরি করা উচিত।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম বলেন, পাথর-বালু ধ্বংসে যারা জড়িত, কমবেশি সবার নামই গণমাধ্যমের কল্যাণে উঠে এসেছে। এদের নাম তালিকায় না থাকা বিস্ময়কর। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটসহ বিভাগের কয়েকটি উপজেলায় যেসব বালু-পাথরখেকোর কারণে বেশ কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদের নাম না থাকায় তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বচ্ছতার জন্য নাগরিক (স্বজন) সিলেটের সদস্য প্রণব কান্তি দেব বলেন, চিহ্নিত অপরাধীদের ব্যাপারে পুলিশ যদি এমন উদাসীনতা দেখায়, তাহলে আমরা কার কাছে সুশাসন আশা করব। আশা করি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথমে পাথর-বালুখেকোদের তালিকার বিষয়টি নলেজে নেই বলে জানান পুলিশের সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ। পরে তার কার্যালয়ের আদেশের তারিখ ও স্বাক্ষরকারীর নাম উল্লেখ করলে প্রশ্ন জানতে চান তিনি। ডিআইজি মফিজ উদ্দিন বলেন, সরকারের নির্দেশে বর্তমানে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এগুলো মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন দেখে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করি। কেউ অবৈধ কাজ যাতে না করে সেটা দেখি। তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো কাগজ চাইলে আমরা পাঠাই। ভুলের সংশোধন হওয়াই সবার কাম্য। আপনাদের কাছে যদি সঠিক কোনো তালিকা থাকে আমাদের দিতে পারেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ট্রাফিক) শাহিনুর আলম খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলা বিশেষ শাখার পুলিশ সুপারদের কাছে ১০ কার্যদিবসে চিহ্নিত পাথর ও বালুখেকোদের তালিকা চাওয়া হয়।

জেলা বিশেষ শাখা হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ৩০ সেপ্টেম্বর ৪৩ জনের, মৌলভীবাজার ১০ অক্টোবর ৩৮ জনের, সুনামগঞ্জ ১১ অক্টোবর ৯৬ জনের এবং সিলেট ২৭ অক্টোবর ৪৫ জনের তালিকা পাঠায়। বিভাগের চার জেলার বিশেষ শাখার পুলিশ সুপারদের পাঠানো তালিকা যুগান্তরের কাছে রয়েছে।

সিলেট জেলায় ৪৫ জন হলেন-বিশ্বনাথ উপজেলার মোল্লারগাঁওয়ের রফিকুল ইসলাম, রাজাপুরের মুক্তার আলী, বিদ্যাপতির আবদুর রহমান, জাগিরালার জহির মিয়া ও হাজরাইয়ের বাবুল মিয়া।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জালিয়ারপাড়ের হুশিয়ার আলী, কালা মিয়া, সোনা মিয়া, মনির মিয়া, আলী হোসেন, দেলোয়ার, বাবুল মিয়া, চিকাডহরের গরীব উল্লাহ, আলী নুর, আনফর আলী, আবদুল হান্নান, ফিরোজ মিয়া, রাজু, বাবুলনগরের ইছনাত, পাড়ুয়া মাঝপাড়ার হাছনু চৌধুরী, নারাইনপুরের সোরাব আলী, আঞ্জু মিয়া, জব্বার, আবদুল মিয়া, পাড়ুয়া উজানপাড়ার আবদুল মালিক, চিকাডহর নারায়ণপুরের আবদুর রহিম, গৌছ মিয়া, কাঁঠালবাড়ির মোহাম্মদ আলী ও শওকত, খায়েরগাঁওয়ের আলম মেম্বার, গৌখালেরপাড়ের রুস্তুম আলী, মোশাহিদ ও আলী হোসেন, কলাবাড়ির বিল্লাল, রুয়েল, শাহাব উদ্দিন, নতুন বালুচরের কাজল সিংহ, ঢালারপাড়ের করম আলী, আলী আব্বাস, মরম আলী, এশাদ, কোম্পানীগঞ্জের আনোয়ার শামীম, আজিম, চাটিবহর গ্রামের আবদুল্লাহ, তেলিখালের মাসুক।

তালিকায় সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলার কারও নাম নেই। অথচ এই তিন উপজেলাতেই সিলেটের চিহ্নিত পাথরখোকোরা রয়েছেন।

মৌলভীবাজার জেলায় ৩৮ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-সদর উপজেলার খালিশপুরের ময়নুল বক্স, সোমারাইয়ের মহসিন আলী (মুনসুর মেম্বার), গিয়াসনগরের মনাই মিয়া।

শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট রোডের ইউসুফ আলী, উত্তর ভাড়াউড়ার ভানু লাল রায়, শ্যামলী আবাসিক এলাকার মাসুদুর রহমান মাসুদ, কবির মোল্লা, রাজাপাড়ার কদর আলী, আহমদ মিয়া, কালাপুরের শহীদ মিয়া, সিরাজনগরের সাহান, কুতুব মিয়া, উত্তর লামুয়ার মুক্তু মিয়া, রাজাপুরের রুবেল মিয়া, মাইজদিহি পাহাড়ের আব্বাছ মিয়া।

রাজনগর উপজেলার পানিশাইলের (নিজগাঁও) নানু মিয়া, ফয়ছাল মিয়া, জাদুর গোল পূর্বখাসের বাদল মিয়া। তালিকায় কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও জুড়ি উপজেলার কারও নাম নেই।

হবিগঞ্জ জেলায় ৪৩ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-বাহুবল উপজেলার আব্দানারায়ণপুরের খন্দকার মঞ্জুর আলী, খন্দকার সোহেল মিয়া, জসিম উদ্দিন, হাজীবাদামের তুহিন মিয়া, মিরেরপাড়ার আজমান উল্লা, আরিফ উল্যাহ, আবদুর রব, রিপন মিয়া।

মাধবপুর উপজেলার শ্রীধরপুরের কামাল মিয়া, মুসেল মিয়া, মনতলার মিটু মিয়া ড্রাইভার, হরিশ্যামার তাপস চন্দ্র দাস, বরুড়ার হারুন মিয়া, ইটাখলার ফরিদ মিয়া। চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুরের তাজুল মিয়া, মহিমাউড়ার রুবেল, আবেদিন, হলহলিয়ার আলমগীর মিয়া, সাইফুল মিয়া, আবদুল্লাহপুরের ফরহাদ মিয়া, বাচ্চু মিয়া, রোমান মিয়া। তালিকায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কারও নাম নেই।

তালিকায় সুনামগঞ্জ জেলায় ৯৬ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-বিশ্বম্ভপুর উপজেলার আদাংয়ের আবুল কাসেম, কাজল মিয়া, ইসলাম উদ্দিন, পুরান মথুরকান্দির রেজাউল করিম রতন, ছত্তার মিয়া; দিনারপুরের জহিরুল ইসলাম ওরফে জজ মিয়া, কালিপুরের (ডলোরা) জহিরুল ইসলাম, সুলেমান মিয়া।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাইয়ারগাঁওয়ের আনোয়ার হোসেন আনু, মকবুল হোসেন মোঘল, আনোয়ার হোসেন আনু, সাদেক হোসেন, শুক্কুর মিয়া, মুক্তার হোসেন। তাহিরপুর উপজেলার ঘাগটিয়ার লায়েক মিয়া ওরফে হাবিবুর, এমদাদুল হক, শামছু মিয়া, মোশারফ মিয়া, মোশাহিদ মিয়া, আজিনুর, আলিম, আবদুল আহাদ, তাজুল ইসলাম (মোড়ল)। জামালগঞ্জ উপজেলার আমানীপুরের আবারত আলী, মোশারফ হোসেন, তেলিয়ার তোফায়েল আম্বিয়া। দোয়ারাবাজার উপজেলার পশ্চিম চাইরগাঁওয়ের তবরিজ আহমদ। তালিকায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কারও নাম নেই।

সবুজ সিলেট/ডিসেম্বর ২৪/হাসান