শোকে কাতর সিলেট

17

নিজস্ব প্রতিবেদক :: শেষ হচ্ছে ২০২০ সাল। ওই সালে সিলেটবাসী হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের। সবার মাঝেই শোকের ছায়া। প্রায় পুরো বছরজুড়েই ছিল করোনার ভয়াল থাবা। সিলেটের পরিচিত অনেক মূখকেই কেড়ে নিয়েছে মহামারি করোনা ভাইরাস। এখনো বিশ্বব্যাপি চলছে করোনার তান্ডব। সিলেটের সব দুশ্চিন্তা প্রবাসীদের নিয়ে। নজর রাখছেন লন্ডন ও নিউইয়র্কে। সরকারি হিসেব মতে চলতি ৯ মাসে সিলেটে করোনায় মারা গেছেন ২৬২ জন।

বাংলাদেশে যখন প্রথম করোনাক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন, সেই ব্যাক্তি ছিলেন সিলেটের প্রয়াত ডাক্তার মঈন উদ্দিন। ৫ এপ্রিল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনের করোনা আক্রান্তের রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এরপর থেকে তিনি নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় তাঁর বাসায় আইসোলেশনে ছিলেন। তিনিই সিলেটের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী ছিলেন। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল রাতে তাঁকে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়।

পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৫টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৫ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে এটাই ছিল প্রথম মৃত্যু। এরপর করোনা কেড়ে নিয়েছে সিলেটের গণমানুষের নেতা, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে।

৫ জুন কামরানের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের পর তিনি নিজ বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে শা¦সকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে নেয়া হয় সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে ঢাকার সিএমএইচ-এ নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ই জুন সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জনতার কামরান। তার মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা সিলেটবাসি। কামরানকে দাফন করা হয় নগরীর মানিক পীর (রহ.) মাজার টিলায়। সেই শোক সইতে না সইতে খবর আসে বিএনপি’র শীর্ষ নেতা এম এ হক করোনাক্রান্ত। তিনি ১৫ জুলাই নগরীর নর্থ ইস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। করোনাকালে তিনি মানুষের সেবায় ব্যাস্ত ছিলেন। তার মৃত্যুরপর বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। এম এ হককে দাফন করা হয় তার গ্রামের বাড়ি গহরপুর এলাকায়। সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে দুই অভিভাবককে হারানোর পর এখন অনেকেই ছন্নছাড়া।

করোনার ভয়াল থাবা থেকে শেষ রক্ষা পায়নি সিলেটের মিডিয়া অঙ্গন। সিলেটে কর্মরত সাংবাদিকদের করোনা আক্রান্তের খবর পেয়ে যখন সবাইকে শান্তনা দিয়ে পাশে দাড়িয়েছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিম। তখন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিম করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বৃহস্পতিবার তাকে সিলেট সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ৯ অক্টোবর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিসিআর ল্যাবে তার নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট পজেটিভ আসে। আর ১৯ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে সিলেটের মিডয়াঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। কর্মজীবনে আজিজ আহমদ সেলিম বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক যুগভেরীতে যোগদান করেন। ১৯৮৯ সালে আজিজ আহমদ সেলিম যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। পরবর্তী সময়ে যুগভেরী দৈনিক হিসেবে যাত্রা করে। ১৯৯৩-৯৪ সেশনে তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে আজিজ আহমদ সেলিম সিলেট জেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন এবং পরে টানা দুইবার সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি দৈনিক উত্তরপূর্ব’র জন্ম থেকে প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিটিভির সিলেট জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।

এছাড়া আজিজ আহমদ সেলিম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অনুপ্রেরণায় গঠিত সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি, সুজন সিলেট জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বাংলাদেশ ভারত-মৈত্রী সমিতি সিলেটের সভাপতি হিসেবে সামাজিক উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৭ মে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ৭ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সবাপতি দবির মিয়া। আর করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে করোনাক্রান্ত হয়ে ২ জুলাই তিনি শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৩ জুলাই তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। আর ৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি ছিলেন সিলেট শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে কর্মরত সিনিয়র স্টাফ নার্স (নার্সিং কর্মকর্তা)। এছাড়াও ৩০ এপ্রিল হৃদরোগ ও ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন সিলেট জেলা পরিষদের ৩নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম ইছন। ২৭ অক্টোবর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম (৫০)।

২০ ডিসেম্বর হৃদযন্ত্রেও ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারাযান সিলেট উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি, সমাজসেবী, ভার্থখলার বাসিন্দা মো. আলী আহমদ। ২২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, কদমতলী ফল মার্কেট ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি, বদিকোনা জামে মসজিদের মুতাওয়াল্লী, সিলেট ট্রেড সেন্টার ভেজিটেবল মার্কেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সিলেট জেলা কয়লা আমদানি কারক সমিতির সাবেক সভাপতি, শুভেচ্ছা কমিউনিটি সেন্টারের সত্ত্বাধিকারী হাজী বশির মিয়া। ২৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা ইয়াসমিন।

২৭ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হাজী আনোয়ারুল ইসলাম। এছাড়াও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারের নার্স (পুরুষ) রুহুল আমিন, প্রবীণ আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ চৌধুরী আব্দুল্লাহ, আরএল ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন খোকাসহ অনেক জ্ঞানী ও গুণীদেও হারিয়েছে সিলেটবাসি। ২০১০ সালে স্বজনদের হারিয়ে শোকে কাতর সিলেটবাসি।

সবুজ সিলেট/ ৩১ ডিসেম্বর/ এহিয়া