প্রবাসী ও রফতানিকারকদের জন্য যা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

7

সবুজ সিলেট ডেস্ক::
মহামারি করোনার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি যাতে শক্তিশালী থাকে, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মধ্যে প্রবাসী ও রফতানিকারক; বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তা ছিল অন্যতম। সরাসরি রফতানিকারকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে প্রবাসীদের আয়ের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনাও দেওয়া হয়েছে। আবার টাকার মান ধরে রেখেও বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানিকারক ও প্রবাসীদের পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টাকার মান ধরে রাখতে গত বছরের শেষ ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৫৫০ কোটি ডলার কিনেছে। টাকার অংকে যা প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ডলার কেনা হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। যার কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে হেরফের হয়নি।
গত বছরের ১ জুলাই আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার পেতে যেখানে ৮৪ টাকা ৮৫ পয়সা ব্যয় হয়েছে, সেখানে গত ৩১ ডিসেম্বর লেনদেন হয়েছে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার না কিনলে এতদিনে প্রতি ডলারের দাম ৮০ টাকার নিচে নেমে যেত। ডলার কেনায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদও চার হাজার ৩০০ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ। গত বছর ছিল তিন হাজার ২৫০ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনায় ডলারের চাহিদা না থাকলেও প্রবাসী আয় বেড়েছে, তাতে ডলারের দাম কমে যাওয়ার কথা। ডলারের দাম কমলে শক্তিশালী হতো টাকার মান। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। ডলারের দাম কমে না যাওয়ায় প্রবাসীরা দেশে বানের পানির মতো রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। আর এই রেমিট্যান্সের কারণেই তারল্য সঙ্কট কেটেছে ব্যাংকের।
২০১৯ সালের শেষে এবং ২০২০ সালের শুরুতে ব্যাংকের তারল্যের যে সঙ্কট ছিল তা দূর হওয়াতে ব্যাংক সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা সহজ হয়েছে। এই রেমিট্যান্সে ভর করে বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন ৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নিবার্হী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার সিদ্ধান্তটি সঠিক। তিনি মনে করেন, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশলটা ভালো কাজ দিয়েছে। এই রেমিট্যান্সের কারণে সার্বিক অর্থনীতি উপকৃত হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সবমিলিয়ে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এক হাজার ৫৯২ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে মহামারির বছরেই রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এসেছে দেশে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। এ ছাড়া ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ২১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালের পুরো সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। এর আগে এক বছরে বাংলাদেশে এত রেমিট্যান্স আর কখনও আসেনি। ২০১৯ সালে ১৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
এদিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপকের মন্তব্য হলো- বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার না কিনলে ডলারের মান পড়ে যেত। এতে টাকার মান শক্তিশালী হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন রফতানিকারক ও প্রবাসীরা। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজার থেকে ডলার কেনাটা রফতানিকারক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হলো- সাধারণত, টাকার মান বাড়লে আমদানি ব্যয় কমে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমে। জিনিসপত্রের দামও কমে। টাকার মান কমলে পণ্য রফতানি করে বেশি টাকা পাওয়া যায়। একইভাবে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বেশি টাকা ভাঙানো বা উঠানো যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রফতানিকারকদের কথা চিন্তা করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কেনা অব্যাহত রাখবে।
প্রসঙ্গত, গত মার্চের পর থেকে বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাবে অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। বাংলাদেশের রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ে বড় ধাক্কা লাগার উপক্রম হয়। তখন প্রবাসী আয়ে কিছুটা কম ধাক্কা লাগলেও এপ্রিলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশের রফতানি খাত। তখন রফতানি আদেশ রাতারাতি স্থগিত হতে থাকে। আবার বিদেশি ক্রেতারা অনেক রফতানি আদেশ বাতিলও করে দেন। একইসঙ্গে পাইপলাইনে থাকা রফতানি আয় আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। আবার কাজকর্ম হারিয়ে বিদেশ থেকে শ্রমিকরাও ফিরে আসতে থাকেন। তাদের দীর্ঘদিনের জমানো অর্থ একসঙ্গে নিয়ে আসায় রেমিট্যান্স অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।
এতে এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, অপর দিকে আমদানি ব্যয় কমে যায়। আবার কমে যায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও। এতে বেকায়দায় পড়ে ব্যাংকগুলো। যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে আসতে থাকে ব্যাংকগুলোর কাছে তা বোঝা হিসেবে দেখা দেয়।
ব্যাংকগুলোর এমডিরা জানিয়েছেন, বাজারে ডলারে চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো তা বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এমনি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের হাতে থাকা উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে দেয়।
প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে মজুদ রাখতে পারে না। মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অতিরিক্ত মজুদ থাকলে দিন শেষে হয় বাজারে বিক্রি করতে হবে, নতুবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। তা না হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জরিমানা গুনতে হয়। করোনার প্রভাবে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা কমে যায়। বাজারে বিক্রি করতে না পারায় ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়।

সবুজ সিলেট/০৪ অক্টোবর/ শামছুন নাহার রিমু