টিকটক নিয়ে সংঘর্ষেও জড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংগুলো

8

সবুজ সিলেট ডেস্ক::
টিকটকে ভিডিও তৈরির কথা বলে গাজীপুরের টঙ্গি থেকে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীকে (১৩) ঢাকায় এনে তিনদিন আটকে রেখে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে একটি ‘টিকটক কিশোর গ্যাং গ্রুপ’। এটি সদ্যবিদায়ী ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বরের ঘটনা। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিশোর গ্যাংয়ের মূলহোতা শিশিরসহ দুজনকে রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

টিকটক ঘিরে এমন অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে প্রতিদিন। টিকটক স্টার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর কিশোররা এমন আরও অপরাধে জড়াচ্ছে। ভিডিও কন্টেন্টে লাইক, কমেন্ট পাওয়ার জন্য মরিয়া গ্যাংগুলো মুহূর্তেই জড়িয়ে যাচ্ছে বিরোধে। ভার্চুয়াল বিরোধ একপর্যায়ে বাস্তব সংঘর্ষেও রূপ নেয়।

এলাকাভিত্তিক টিকটকের ‘কিশোর গ্যাং’গুলো বিভিন্ন পার্ক, খোলা জায়গায়, ফুটপাতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে একত্রিত হয়ে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরির নামে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, ইভটিজিং, পথচারীদের গতিরোধ, বাইক মহড়াসহ বিভিন্ন অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকে। এসব কন্টেন্ট তারা নিজেদের টিকটক ও লাইকি আইডিতে আপলোড দেওয়ার পর লাইক-কমেন্ট পেতে রীতিমত জোর-জবরদস্তি শুরু করে। গ্রুপগুলো একে অপরের ভিডিও কন্টেন্টে ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ করার আহ্বান জানায়। এক গ্রুপ লাইক বা কমেন্ট করার পর অপর গ্রুপটি যদি না করে এ নিয়েও গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যা হাতাহাতি, মারামারিতেও গড়ায়।

শ্যামপুরের রাহাত। বয়স ১৭ বছর। নিউমার্কেটের একটি ক্রোকারিজের দোকানে কাজ করে। মাসে সাত হাজার টাকা বেতন পায়। নয় মাস ধরে সে টিকটক-এ আপলোড করে আসছে। এ কাজে তার আছে বিচিত্র সব পোশাক ও সরঞ্জাম। টিকটকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাতিরঝিলে তার সঙ্গে কথা হয়। রাহাত বলেন, ‘ভালোলাগে তাই টিকটক করি। আমার ১১ হাজার ফলোয়ার আছে। তারা আমাকে লাইক কমেন্ট করে। ভালোই লাগে। অনেকে শুনেছি বিভিন্নভাবে আয় করে। তবে আমার এখনো আয় হয়নি। খরচ আছে অনেক।’

টিকটক করতে গিয়ে রাহাতের সঙ্গে উত্তরা, মগবাজার, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কিশোরদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সারাদেশে আমাদের বন্ধুবান্ধব আছে। তারা আমাদের সাপোর্ট করে, আমরা আবার তাদের সাপোর্ট করি।’

টিকটকে এই ‘সাপোর্ট’ নিয়েই দ্বন্দ্বের শুরু। ‘সাপোর্ট’ অর্থ অন্যের ভিডিওতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে ভিউয়ার বাড়াতে সহায়তা করা।

গত বছরের আগস্টে এমনই সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপের কথিত দলনেতা অপু ভাই খ্যাত কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সংঘবদ্ধ গ্রুপটি সড়কে টিকটক করার সময় এক পথচারী হাঁটার জন্য জায়গা চাওয়ায় তাকে মারধর করে। পরে ওই কিশোর জামিন পেয়েছে। তবে তার গ্রুপ উত্তরায় এখনও সক্রিয়।

টিকটকের মাধ্যমে রাতারাতি স্টার হতে চাওয়া এসব কিশোরদের প্রতিরোধ করতে গতবছরের আগস্টে নারায়ণগঞ্জে টিকটক গ্রুপ চিহ্নিত করাসহ কিশোর অপরাধ দমনে জেলা প্রশাসনকে ৯টি প্রস্তাব দেয় স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তারা। ‘কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ’ শীর্ষক কর্মশালায় এ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়।

প্রযুক্তিতে যখন যেটা আসছে সেটাই লুফে নিচ্ছে কিশোররা। কিন্তু সেই প্রযুক্তির ব্যবহারের জায়গাটায় তারা গুলিয়ে ফেলছে। এ কারণে কিশোরদের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম।

তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাং কালচার অনেক আগে থেকেই রয়েছে। তবে এর ধরন বদলেছে। এজন্য আমাদের পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

তিনি মনে করেন, ‘অনেক পরিবারের বাবা-মা মনে করেন, তার কিশোর বা কিশোরী সন্তানটি যা করেছে এটিই সমাজের ট্রেন্ড। এটা ভালো, তারা তাই মেনে নেয়। কারণ ওইসব বাবা-মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নেট দুনিয়া সম্পর্কে জানাশোনা কম। তাই তারা তাদের সন্তানদেরই বিশ্বাস করে। কিন্তু সন্তানরা বাবা-মায়ের সরলতার সুযোগ নিয়ে বখে যায়।’

তাছাড়া পাড়া-মহল্লার খেলাধুলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করার সুযোগ না থাকায় ছেলেমেয়েরা নেট দুনিয়াতেই পড়ে থাকছে। এখানে তাদের বয়সীদের মধ্যে খুব দ্রুত কানেকশন ও নেটওয়ার্ক হচ্ছে। এ কারণে খেয়ালের বশে অপরাধেও জড়াচ্ছে বেশি। এমনটাই মনে করেন সাদেকা হালিম।

সবুজ সিলেট /১১ জানুয়ারি/শামছুন নাহার রিমু