সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন, আওয়ামীপন্থী প্রার্থীদের ভরাডুবির নেপথ্যে

46


সাদিকুর রহমান সাকী
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে এবারো ধরাশায়ী হয়েছেন আওয়ামীপন্থী প্রার্থীরা। জেলা বারে সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ভোটের হিসেবে তা নেই। ফলে বারবার ভরাডুবি হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমর্থক প্রচুর থাকলেও দায়িত্বশীল ব্যক্তির অভাবের কারণে এই ফলাফল বিপর্যয়। যা নিজেদের ব্যর্থতা হিসেবেই মানছেন তারা।

যে কারণে সভাপতি পদে বিএনপিপন্থী আইনজীবী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি এটিএম ফয়েজ উদ্দিন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী সরওয়ার আহমদ চৌধুরী (আবদাল)-কে হারিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হলেও হারেননি বিএনপিপন্থী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফজলুল হক সেলিম।

আওয়ামীপন্থী আইনজীবী মাহফুজুর রহমানের সাথে সমান সংখ্যক ৬২৭টি ভোট পেয়েছেন। দু’জনের ভোট সমান হওয়ায় সাধারণ সম্পাদকের ফলাফল স্থগিত রয়েছে। আজ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসারা কথা রয়েছে। সিলেট জেলা বারের ইতিহাসে সাধারণ সম্পাদক পদে এবারই প্রথম এরকম ঘটনা ঘটায় এবং গঠনতন্ত্রে এনিয়ে কিছু লেখা না থাকায় ফলাফল নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের এই ফলাফলের পর বেশ কিছু বিষয় আলোচিত হচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের বার বার ভরাডুবি। এবার সভাপতি পদে আগে থেকেই এগিয়ে ছিলেন বর্তমান সভাপতি এটিএম ফয়েজ উদ্দিন। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে লড়াইয়ে এগিয়ে ছিলেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী মাহফুজুর রহমান। কিন্তু ভোটের হিসেবে দেখা গেল সমানে সমান। তাই প্রশ্ন উঠেছে এবারো আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভোট দেননি। অথচ সংখ্যার হিসেবে সিলেট বারে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের থেকে আওয়ামী আইনজীবীদের সংখ্যাই বেশি বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ভোটের হিসেবে কেনো তারা হেরে যাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ (বর্তমানে বিলুপ্ত) এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্ঠা মন্ডলির সদস্য এডভোকেট মইনুল ইসলাম বলেন, এখানে আমাদের আংশিক ব্যর্থতা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ বিলুপ্ত করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠন করার কথা থাকলেও এটি এখনো পূর্ণতা পায়নি।

মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ সহ দায়িত্বশীলদের নির্দেশে প্রায় ৫০০ আইনজীবীকে সদস্য হিসেবে সংগ্রহ করা হলেও কমিটি হয়নি। সিলেট বারে আওয়ামী আইনজীবীর সংখ্যা বেশি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সমর্থক প্রচুর থাকলেও সংগঠিত না হওয়ায় ফলাফল আমাদের পক্ষে আসছে না। এটা কিছুটা হলেও নিজেদের ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেন তিনি। নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকাটাকেও একটা কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমর্থক অনেক আছেন, কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যক্তির অভাবের কারণে ফলাফল আমাদের পক্ষে আসেনি। স্বাধীনতার স্বপক্ষের দেলোয়ার হোসেন দিলু সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এবার প্রার্থী হয়ে ৭৩টি ভোট পেয়েছেন। যদি কেউ দায়িত্ব নিয়ে তাকে বসাতে পারতেন তাহলে এই ভোটগুলো মাহফুজুর রহমান পেতেন। কিন্তু এই কাজটি কেউ করেননি।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মো. লালা বলেন, সিলেট জেলা বারে আওয়ামী আইনজীবীদের সংখ্যা বেশি থাকলে এখানে এটার প্রভাব পড়ে না। এখানে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরাই নিজেদের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিএনপিপন্থী প্রার্থীদের ভোট দিয়ে থাকেন। বিপরীতে বিএনপিপন্থীরাও আওয়ামীপন্থী প্রার্থীদের ভোট দিয়ে থাকেন। ফলে অনেক সময় ফলাফলে ভিন্নতা ঘটে। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব নয় অনেকটা নিরপেক্ষ ভোট হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাহফুজুর রহমান আওয়ামী লীগের সব ভোট পেলে তিনি বিজয়ী হতেন।
এদিকে কোন প্রক্রিয়ায় সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ রোববার বৈঠকে বসছে সমিতির নির্বাচন কমিশন। সমিতির প্রধান নির্বাচন কমিশনার এডভোকেট মো. এমদাদুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, সাধারণ সম্পাদক পদে মাহফুজুর রহমান ও ফজলুল হক সেলিম দুজনেই ৬২৭টি ভোট পাওয়ায় এই পদে বিজয়ী প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন কমিশন আজ রবিবার বৈঠকে বসছে। বৈঠকে সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক পদে দুইজন প্রার্থী সমসংখ্যক ভোট অর্জন করায় এই পদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। রোববার সমিতির উপদেষ্টা কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমরা বৈঠকে বসব। বৈঠকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুনর্গণনা ছাড়াও আরও তিনটি উপায়ে এই পদে সমসংখ্যক ভোট পাওয়া প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে বলে সমিতি সূত্রে জানা গেছে। গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কী আছে জানতে চাইলে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক এ সভাপতি বলেন, ‘চারটি উপায়ে এই পদে একজনের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। দুপক্ষের উপস্থিতিতে এই পদের ভোট পুনর্গণনা করা হতে পারে। সেটা করলে হয়ত একটি দুটি ভোটের ব্যবধান হতেও পারে। এই পুনর্গণনা নতুন কিছু নয়। বছর দুয়েক আগেও সিলেট বারের নির্বাচনের একটি পদে ভোট পুনর্গণনা করা হয়েছে।

পুনর্গণনায়ও ফলাফল সমান হলে এই পদে আবারও ভোট গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সেটা না করতে চাইলে আরও দুটি উপায় রয়েছে। এগুলো হলো লটারির মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক পদে একজনকে নির্বাচিত করা। আরও একটি উপায় হলো দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া। ছয় মাস করে দুজন সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করবেন।’ তিনি জানান, গঠনতন্ত্রে এগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ নেই। তবে অন্যান্য জায়গায় এসব নিয়মই অবলম্বন করা হয়। সেগুলোকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়ে উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সভাপতি পদে এটিএম ফয়েজ উদ্দিন পুননির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক পদে মাহফুজুর রহমান ও ফজলুল হক সেলিম ৬২৭টি করে ভোট পান।

সবুজ সিলেট/ কাওছার

  •