গোলাপগঞ্জের পারভেজ নানা জালিয়াতি করছে যেভাবে

61


স্টাফ রিপোর্টার
সিলেট সিটি কর্পোরেশনে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বানিয়েছিলেন জাল জন্মসনদ। এর অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসছে সাপ।

‘সিসিক থেকে জাল স্মার্ট কার্ড দিয়ে প্রতারকের জন্মসনদ তৈরি’ শিরোনামে গত বৃহস্পতিবার দৈনিক সবুজ সিলেটে খবর বের হয়। খবরটি প্রকাশের পর গোলাপগঞ্জের ওই যুবকের আরো অজানা জালিয়াতির ঘটনা বেরিয়ে আসছে। তার নাম পারভেজ আহমদ। বয়স ২১ বা ২২। তিনি গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউপির বসন্তপুর গ্রামের তাজ উদ্দিনের ছেলে।

পারভেজ আহমদ ও তার খালাতো ভাই শরীফগঞ্জ ইউপির পানিআগা গ্রামের ওমর আলীর ছেলে মিজানুর রহমানকে আসামি করে ২০২০ সালে গোলাপগঞ্জ পৌরসভার রণকেলী গ্রামের মৃত আওলাদ হোসেনের ছেলে সাংবাদিক সেলিম হাসান কাওছার একটি মামলা দায়ের করেন। প্রতারণামূলক চুরি ও হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ এনে ২০২০ সালের ১৪ জুলাই আদালতে মামলা করেন তিনি। মামলা নম্বর ১৭০।

২০২০ সালের ১ অক্টোবর পারভেজ আহমদের মা রহিমা বেগম পারভেজকে মামলা থেকে বাঁচানোর জন্য আদালতে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। পারভেজের জামিন নেওয়ার জন্য সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাঁকন দের আদালত থেকে আদালতে জাল জন্মসনদ ও ৮ম শ্রেণি থেকে উত্তীর্ণ হওয়া গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি হাজিপুর আইডিয়েল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি প্রশংসাপত্র দিয়ে তাকে শিশু বানিয়ে সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (জেলা জজ) বিচারক মোঃ মোহিতুল হকের আদালতে মামলাটি স্তানান্তর করিয়ে জামিন নেন। পরে ওই মামলার বাদি তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে জাল জন্মসনদের তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করেন। জামিন নেওয়ার সময় আদালতে দাখিলকৃত জাল জন্মসনদের তার বয়স উল্লেখ করা হয় ১৭ বছর ৬ মাস। আদালতে দাখিলকৃত জাল জন্ম নিবন্ধন নাম্বার ২০০৮৯১১৩৮৩৬০০২৩৭৫।
প্রত্যেক জন্মসনদে নিবন্ধিত জন্মসনদের প্রথম ৪টি সংখ্যা ব্যক্তির জন্ম সাল বোঝানো হয়। আর ওই জন্মসনদের প্রথম ৪টি সংখ্যার মিল না পাওয়ায় বাদির সন্দেহ হলে অনলাইনে যাচাই করার পর অনলাইনে না পেয়ে অভিযুক্ত পারভেজের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মুহিত হীরার কাছে নিয়ে গেলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের রেকর্ড যাচাই করে তা পাননি। তাই তিনি আদালতে দাখিলকৃত জন্মসনদটি জাল বলেন এবং অনলাইনে থাকা আসল জন্মসনদের একটি কপি সত্যায়িত করে দেন। অনলাইনে থাকা আসল জন্মসনদে তার বয়স ২১ বছর। যার নম্বর ২০০০৯১৯৫০১৫৫৯৯৫৪৭। অনলাইনে থাকা আসল জন্মসনদটি পারভেজের পাসপোর্টেও রয়েছে। পাসপোর্টের রসিদ নম্বর (৮১৭৭৯৬) পাসপোর্ট ৯১০১০০০০০৮১৭৭৯৬। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সত্যায়িত করা অনলাইন কপি সংরক্ষিত আছে।
শিশু আদালতে দাখিলকৃত হাজিপুর আইডিয়েল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রশংসাপত্র যাচাই করতে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ পারভেজের ভর্তি হওয়া ও হাজিরা খাতায় কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

অপরদিকে প্রতারক পারভেজের মা রহিমা বেগম ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট গোলাপগঞ্জ পৌরসভার রণকেলী গ্রামের মৃত আওলাদ হোসেনের ছেলে সেলিম হাসান কাওছারকে আসামি করে মামলা করেন। এই মামলায় পারভেজের মা আদালতে একই জাল জন্মসনদ দাখিল করেন। এ মামলায় রহিমা বেগম তার ছেলে পারভেজকে গোলাপগঞ্জ সরকারি এম সি একাডেমী স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে উল্লেখ করেন। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর প্রতারক পারভেজের তথ্য চেয়ে গোলাপগঞ্জ সরকারি এম সি একাডেমী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বরাবরে চিঠি পাঠানোর পর ৫ জানুয়ারি তিনি চিঠির উত্তরে জানিয়েছেন,পারভেজ আহমদ নামে কোনো শিক্ষার্থী তার প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৯ সালের জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি এবং এই নামে তাদের রেকর্ডে কোনো শিক্ষার্থীও নেই। একই তারিখে পারভেজের ভর্তির তথ্যপ্রমাণ চেয়ে বসন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বরাবরে চিঠি দেওয়ার পর চিঠির কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইল ফোনে জানান, রেকর্ডে অন্যান্য শিক্ষার্থীর তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলেও এই নামে কোনো শিক্ষার্থীর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২০২০ সালের ১৪ জুলাই গোলাপগঞ্জ পৌরসভার রণকেলী গ্রামের মৃত আওলাদ হোসেনের ছেলে সাংবাদিক সেলিম হাসান কাওছার জালিয়াত চক্রের সদস্য পারভেজ ও তার খালাতো ভাই ইমনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন। ছেলেকে বাঁচাতে প্রায় দেড় মাস পর পারভেজের মা রহিমা বেগম একাধিক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ এনে পাল্টা মামলা দায়ের করেন। তাদের এই অভিযোগে সাংবাদিক কাওছারের পুরনো প্রতিপক্ষদের সাক্ষি করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পারভেজ পরিবার ২০১৬ সালে নিজ গ্রাম থেকে গোলাপগঞ্জ উত্তর বাজার ছিটা ফুলবাড়ী এলাকার বেগম মঞ্জিল নামে ৫ম তলা একটি বাসায় এসে ওঠে। কাওছার তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর তারা গ্রামের বাড়িতে চলে যান। গত ৭ ফেব্রæয়ারি সিলেটের পুলিশ সুপার ও ৮ ফেব্রæয়ারি সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির কাছে পারভেজ ও তার মা রহিমা বেগমের বিভিন্ন অপকর্মের ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার দৈনিক সবুজ সিলেটে ‘সিসিক থেকে জাল স্মার্ট কার্ড দিয়ে প্রতারকের জন্মসনদ তৈরি’ শিরোনামে প্রকাশ হয়। প্রকাশ হওয়া ওই শিরোনামের সংবাদে বলা হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউপির বসন্তপুর গ্রামের তাজ উদ্দিনের ছেলে পারভেজ আহমদ (২২) ভ‚য়া স্মার্ট কার্ড ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছয়ফুল আলম বাকেরের সিল স্বাক্ষর জাল করে জন্মসনদ তৈরি করে। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সিটি কর্পোরেশন থেকে জন্মনিবন্ধন তৈরির পর পাসপোর্টও বানায় পারভেজ। তৈরি করা পাসপোর্টের রসিদ নম্বর (৮১৭৭৯৬)। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বানানো ২০০০৯১৯৫০১৫৫৯৯৫৪৭ জন্ম নিবন্ধন নম্বর রয়েছে পাসপোর্টে।
অবশ্য সিলেট সিটি কর্পোরেশনের জন্মনিবন্ধন শাখার কর্মকর্তারা জালিয়াতির বিষয়টি যাচাই করার পর জানিয়েছেন পারভেজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও জন্মসনদ বাতিল করা হচ্ছে।

সবুজ সিলেট / শামসুন নাহার রিমু

  •