সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি নেই কর্মসংস্থানের সুবিধা

13

<><> সুবর্ণা হামিদ <><>
হিজড়াদের জীবনে যেনো বঞ্চণার যেনো শেষ নেই, জন্মই যেনো তাদের আজন্ম পাপ। অবহেলা ও অসম্মানের সাথে জীবন-যাপন করতে হয় তাদের। বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকা হিজড়ারা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে চায়। কিন্তু সমাজ বাস্তবতার নানা অসঙ্গতির কারণে তা হয়ে ওঠে না। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে জন্ম হলেও নেই তাদের সামাজিক মর্যাদা।
‘যে জীবনে সবকিছু থেকেও নেই, তার নাম হলো হিজড়া। পরিবারে জন্ম নিলেও জায়গা নেই। সমাজে বসবাস করলেও সামাজিক মূল্যায়ন নেই। কর্মক্ষমতা থাকলেও কর্মসংস্থান নেই। দেহ ও একটা সুন্দর মন থাকলেও যা মূল্যহীন। অনেকটা অর্থহীন ভাবেই বেঁচে থাকার নামই হিজড়া জীবন।’ আফসোস করে এই কথাগুলো বলছিলেন মালেকা হিজড়া। তিনি বলেন, রক্তে-মাংশে গড়া আর দশজন মানুষের মতো আমরাও মানুষ, আমাদের একটা মন আছে, চাহিদা আছে। আমরাও চাই এই সমাজে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে। কিন্তু নানা কারণে সেটা আমরা পারছি না। যেখানেই যাই না কেনো শুধু তিরস্কার শুনতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তা কেনো যে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছে তা ভেবে পাই না। ইচ্ছে এই জীবন না রেখে আতœহত্যা করার। যে জীবনের কোন দাম নেই রাষ্ট্র এবং সমাজে সেই জীবন রেখে কি লাভ বলেন।
মালেকা হিজড়ার মতো আঁখি হিজড়াও তুলে ধরলেন তার দু:খের কথা। তিনি বলেন, আমরাও সাধারণ মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চাই। কাজ কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। সামাজিক জীব হিসেবে চাই সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু কোনটাই তো আমরা পাই না। শুধু বঞ্চণা আর অবহেলা ছাড়া আমাদের কপালে আর কোন কিছু জুটে না। কিন্তু সুযোগ পেলে আমরাও স্বাভাবিক মানুষের মতো কাজ করতে পারবো। ক্ষেত্র বিশেষে তাদের চেয়ে বেশি কাজ করতেও আগ্রহী, কিন্তু তারপরও কেউ আমাদের মূল্যায়ন করে না। অপরাধ আমরা হিজড়া। কিন্তু আমি তো নিজে নিজে হিজড়া হয়ে জন্ম নেইনি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে এভাবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এটা কি আমার অপরাধ।
হিজড়াদের সাথে আলাপকালে সবাই একটি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন সেটা হলো তাদের সামাজিক অবমূল্যায়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে। বাস্তবতা তাদের পক্ষে কথা বলছে। প্রায় সময় দেখা যায় হিজড়ারা জীবিকার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। যাতে করে সাধারণ মানুষ তাদের উপর ক্ষুব্দ ও বিরক্ত হন। এ ব্যাপারে হিজড়ারা বলেন, তারা ইচ্চা করে এমনটা করতে চান না। কিন্তু একটা পর্যায়ে বাধ্য হন এমনটি করতে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন-বেঁচে থাকার জন্য যখন কোন কাজ কর্ম পান না, তথন আর তাদের কিছু করার থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা স্বত্তেও ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা চাঁদা তোলার মতো বিতর্কিত কাজ করতে পেটের দায়ে। তবে কর্ম সংস্থানের সুযোগ করে দিলে তারা কেউই এমন কাজ করতে আগ্রহী নয় বলে জানালেন হিজড়ারা। কিন্তু সেলাই প্রশিক্ষণ কিংবা বিউটিশিয়ান হিসেবে অনেকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে কেউ কাজে নিতে চায় না। অনেকে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত, তারপরও তাদের চাকুরিতে নিতে চায় না। অপরাধ একটাই তারা হিজড়া। সারাদেশের মতো সিলেটের হিজড়াদের অবস্থাও একই। তাদের অভিযোগ সরকার আমাদের শুধু স্বীকৃতি দিয়েই দায় সেরে ফেলছে। আজ পর্যন্ত আমাদের জন্য কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন করেনি। যাতে করে আমরা সমাজ বাস্তবতায় একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারি। এখনো সুরক্ষিত হয়নি মৌলিক অধিকারগুলো। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কিছু সহযোগিতা ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুন বলে জানান তারা। যে কারণে এগুলো হিজড়াদের জীবন যাত্রা পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব এখনো ফেলতে পারেনি। ফলে তাদেরকে বাধ্য হয়েই বিতর্কিত কাজে জড়িত হতে হয় জীবন-জীবিকার তাগিদে।
সিলেটে হিজড়াদের গুরুমা হিসেবে পরিচিত সুন্দরী হিজড়া। যার অধীনে রয়েছে প্রায় ৫ শতাধিক হিজড়া। তিনি কষ্টের সাথে তুলে ধরলেন তাদের দূর্দশার কথা। বললেন বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় কিভাবে কঠিন সংগ্রাম করে ঠিকে আছেন তারা। দু:খ করে বলেন, যে রাষ্ট্র আমাদেরকে একটু দেখভাল করবে সেখানেই আমরা বঞ্চিত প্রতারিত, সুতরাং কোথায় গিয়ে আমরা শান্তি পাবো। তিনি বলেন, সমাজসেবা অধিদফতরের উদ্যোগে হিজড়া ট্রেনিং ও অনুদান এবং ভাতা প্রদান করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় এটা খুবই অপ্রতুল। তার মধ্যে এখানেও দুর্নীতি রয়েছে। হিজড়াদের ট্রেনিং ও অনুদান ভূয়া হিজড়ারা নিয়ে যায়। ভাতা প্রদান করা হলেও তা পায় মাত্র ৬ থেকে ৭ জন হিজড়া। আর ভাতা হিসেবে যে টাকা দেওয়া হয় সেটা বলাও লজ্জাজনক । যতসামান্য টাকা দিয়ে কিচ্ছুই হয় না, কেবল নামেই ভাতা। সাধারণ মানুষ মনে করে হিজড়ারা সরকার থেকে অনেক টাকা পায়, বাস্তবে কিন্তু তা নয়। তারা এই ভাতাকে সম্মানজনক ও পর্যাপ্ত পরিমাণে না দিলেও এটি দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই উত্তম বলে মনে করেন। তাহলে আমরা বলতে পারবো সরকার থেকে কোন কিছুই পাই না। কিন্তু এমন ভাতা দিলেন যা দিয়ে কোন কিছু করা তো দূরের কথা, মুখে উল্লেখ করাও লজ্জাজনক। অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ এককথায় হিজড়াদের জীবন মান উন্নয়নে কোন ভুমিকা রাখে না।
তবে জেলা সমাজ সেবা অফিস সুত্রে জানা যায়, উদ্যোগে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের কে সমাজের মুল ¯্রােতধারায় আনার জন্য ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রশিক্ষণ শেষে উপকরণ সহায়তা হিসেবে মাথাপিছু এককালীন ১০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়। সেই হিজড়াদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। যারা বযস্ত তাদেরকে সমাজসেবা অফিস থেকে ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস জার্নালিষ্ট কমিশনের সভাপতি ফয়সল আহমেদ বাবলু বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের যেমন নানা ধরণের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ত্রুটি থাকে এই অসহায় মানুষগুলোও এরকমই প্রাকৃতিক ত্রুটির শিকার। এখানে তাদের কোন হাত নেই বা দোষ নেই। আমরা যদি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিশেষ মানুষ হিসেবে না ভেবে মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনার কথা ভাবতে পারি তাহলে কেন হিজড়াদের ক্ষেত্রে নয়? একমাত্র তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এবং মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনলে একদিকে যেমন অপরাধের মাত্রা কমবে তেমনি তারা সমাজে স্বাভাবিক মানুষের মর্যাদা নিয়ে যেমন বাঁচবে এবং দেশের জিডিপিতে রাখবে তাদের মূল্যবান অবদান। কোন সমাজ বা রাষ্ট্রে সমতা এবং সাম্যতা আনতে গেলে সবাইকে নিয়ে এক সাথে আগাতে হবে।

  •