আত্মনির্ভরশীলতাই এনে দিতে পারে হিজড়াদের মুক্তি

28

<><> সুবর্ণা হামিদ <><>
সৃষ্টিগত ত্রুটির কারণে আর কোন জনগোষ্ঠীকে এতটা অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয় না, যেটা হতে হয় হিজড়াদের। তারা এই সমাজের অংশ হলেও কোন কিছুতেই নেই তাদের অংশগ্রহণ। সম্পূর্ণ আলাদা একটি জগতে বেড়ে ওঠতে হয় তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষগুলাকে। যে জগত শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ, ভিন্ন এক সমাজ, ভিন্ন সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশে চলে হিজড়াদের জীবন।
হিজড়া শব্দটা শুনলেই যে দৃশ্যপটটা সামনে আসে সেটা হলো- নিস্কর্ম একটি জনগোষ্ঠী। যাদের লিঙ্গ পরিচয়; না পুরুষ, না মহিলা। কর্ম যাদের চাঁদা তোলা (হিজড়াদের বাসায় যেটি চল্লা তোলা)। বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে কিংবা বাজারে গিয়ে দোকান থেকে সাহায্য তোলা যাদের কাজ। এর বাইরে আবার কিছু হিজড়া বিতর্কিত কর্মকান্ডে ও যুক্ত। সবমিলিয়ে বলা যায় অগ্রহণযোগ্য কাজের সাথে জড়িত একটি জনগোষ্ঠীর নাম হিজড়া, সাধারণ মানুষের এটাই ধারণা।
তবে সময়ের পরিক্রমায় হিজড়াদের নিয়ে মানুষের ধারণা পাল্টাচ্ছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হিজড়ারাও এখন তাদের আদি কাজকর্ম থেকে অনেকে সরে আসছে। তারা তাদের আদিপেশা ছেড়ে জীবনযুদ্ধে যুক্ত হচ্ছে মুল¯্রােতের সাথে। পরিবার-পরিজন কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও নিজ কর্ম দক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত করছেন নিজেকে। এখন এমন ঘটনা অহরহই চোখে পড়বে সিলেট তথা সারা দেশে। যে পরিবার একসময় হিজড়া হওয়ার কারণে দেখতে পারতো না। সেই পরিবারের দেখভাল তথা মা-বাবার ভরণ পোষণ করছেন অনেক হিজড়া। লেখাপড়া করার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মমূখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একেক জন আজ সম্পূর্ণ আতœনির্ভরশীল। সমাজের আরও আট দশজন মানুষের মতো নিজেকে গড়ে তুলেছেন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে । ফলে পরিবার কিংবা সমাজের তাদের গ্রহণ যোগ্যতা বেড়েছে। বেড়েছে তার সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় অবস্থান। তবে সংখ্যার হিসেবে এটা আশাব্যঞ্জক নয়। এখনো হিজড়া আমাদের সমাজ বাস্তবতায় আড়চোখে দেখা হয়। যতই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হউক না কেনো তাদেরকে এখনো তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়। বৈশম্য ও অবহেলা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির যতটুকু পরিবর্তন হওয়ার দরকার তা না হওয়ায় এখনো তাদেরকে নানাভাবে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়।
বাংলাদেশে হিজড়াদের সংখ্যা এখনো সঠিক ভাবে নির্ণিত নয়। সেই হিসেবে বিভাগীয় শহর সিলেটেও হিজড়ার সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন মত আছে। তবে এখানে গুরুমার অধীনে আছেন ৫ শতাধিক হিজড়া। তবে এর বাইরে ও অনেক হিজড়া রয়েছেন বলে জানা যায় সিলেটের গুরুমা সুন্দরী হিজড়ার কথায়। তিনি বলেন, হিজড়াদের নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের পাশাপাশি কাজ করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তাদেরকে কর্মমূখী শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি আতœনির্ভরশীল হওয়ার জন্য অনুদানও দেওয়া হয়। হিজড়াদের জীবন মান উন্নয়নে এটা সহায়ক হলেও এতে সন্তুষ্ট নন অনেক হিজড়া। তাদের দাবি এক্ষেত্রে আরো বাস্তবসম্মত ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন সরকারের। যাতে করে প্রকৃতভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়। কিন্তু দেখা যায়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই সুবিধা প্রকৃত হিজড়াদের চেয়ে নামধারী হিজড়ারা।
সিলেটের হিজড়াদের অভিযোগ, তারাও অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো কাজ করে খেতে চান। কিন্তু সেই সুযোগ-সুবিধা তাদেরকে দেওয়া হয় না। অনেকে প্রতিভা থাকা স্বত্তেও তারা কোন মূল্যায়ন পান না। কর্মমূখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও বেকার জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি নিয়ে নিজেরা আতœনির্ভরশীল হতে চান, সমাজের বোঝা হয়ে বাঁচতে চান না তারা।
তবে আশার কথা হচ্ছে হিজড়াদের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ভাবছে সরকার। সিলেটে এক আলোচনা সভায় জানো গেলো সে তথ্য। হিজড়াদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ দিতে বিশেষ কোটা ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে ইউজিসি। তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে সরকারের কাছে এই বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে গত ডিসেম্বরে। যাতে উচ্চ শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীতে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ফজিলাতুন নেসা শাপলা বলেন, পিছিয়ে পড়া এই মানুষগুলোকে এগিয়ে আনতে গেলে তাদের জন্য প্রয়োজন কর্মমুখী বা প্রয়োগিক শিক্ষা । অর্থাৎ যে শিক্ষা তাদের সমাজে চলতে এবং সমাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে সক্ষম হবে। আত্মমর্যাদাবোধ মানুষকে উন্নত জীবন-যাপন করতে সাহায্য করে। অসহায় এই মানুষগুলোকে সম্মান করতে শিখলে, তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে বাড়িয়ে দিলে তারা হয়ে উঠবে আত্মনির্ভরশীল। একমাত্র সামাজিক, শারিরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতাই এনে দিতে পারে হিজড়াদের প্রকৃত মুক্তি।
আর আমরা যে মানুষগুলোকে ঘৃণ্য, অস্পৃশ্য বা অবাঞ্ছিত ভাবছি তাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের দিতে পারি স্বাভাবিক মানুষের মর্যাদা। ইসলামেও এটাই নির্দেশনা আছে। ’নপুংসক” অর্থ ধরে কাউকে ’হিজড়া’ বলে গালি দেওয়া যাবে না। কাউকে ‘মন্দ নামে ডাকা গুণাহ’। [পবিত্র কোরআন, সুরা হুজরাত, আয়াত: ১১]

  •