করোনা পরিস্থিতি বেসামাল

9

নিজস্ব প্রতিবেদক ::
দেশের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে শনাক্ত ও মৃত্যু। রাজধানীর করোনা নির্ধারিত সব হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা মিলছে না। সাধারণ শয্যাও খালি নেই অনেক হাসপাতালে।

ফলে রোগীর স্বজনদের একটি শয্যার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। প্রয়োজনে রোগীকে অক্সিজেন দিতে না পারায় দুই-তিনদিনের মধ্যে তাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। শ্বাসকষ্টসহ তাদের কাউকে বাড়িতে ফেরত নেওয়া হচ্ছে।

সেখানে পরিবারের সদস্যদের সংক্রমিত করছেন তিনি। অনেকেই বাসায়, কেউ কেউ হাসপাতালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। এরপরও অধিকাংশ স্থানে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

মুখে মাস্ক নেই, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করছেন না, জনসমাগম দেখলে সেদিকেই ছুটছে উৎসুক জনতা। এসবের সঙ্গে কমছে টিকা নেওয়ার হার। টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দিকে গড়ে এক লাখ বা তারও বেশি লোক টিকা নিলেও বর্তমানে সেটি ৬০ থেকে ৭০ হাজারে নেমে এসেছে।

এছাড়া সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়। সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে পরীক্ষা করাতে পারছেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা ডেডিকেটেড হিসাবে তালিকাভুক্ত এবং তালিকাভুক্ত নয়- এমন একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শয্যার অভাবে প্রতিদিন রোগীদের ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। দিনদিন করোনা পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়ছে।

গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত একদিনে নতুন করে ৩৯০৮ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা নয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছর ৮ মার্চ দেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এর আগে গত বছরের ২ জুলাই এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেদিন মোট ৪ হাজার ১৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। মহামারি শুরুর পর থেকে সেটাই এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত।

এ নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭১৪ জনে। ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে মোট ৮ হাজার ৯০৪ জনের মৃত্যু হলো।

গত একদিনে পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার বেড়ে ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে, যা ৩১ আগস্টের পর সবচেয়ে বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ২ হাজার ১৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন গত এক দিনে। তাতে এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৯৪১ জন হয়েছে।

এদিকে শয্যার অভাবে অনেক রোগী বাড়িতে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব রোগীর পরিপূর্ণ আইসোলেশন বাসায় সম্ভব নয়। এতে তাদের কারণে সংক্রমণ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে। এছাড়া সঠিকভাবে কোয়ারেন্টিনও করা হচ্ছে না।

এই প্রসঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্তমান রোগীদের ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা না হলে ট্রেন্ড বোঝা যাবে না।

ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তিনি বলেন, যেই ভেরিয়েন্ট এখন দ্রত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করে সব রোগীকে আইসোলেশনে আনতে হবে। পাশাপাশি এদের সংস্পর্শে যারা এসেছে, তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং নিশ্চিত করতে হবে।

পাঁচদিন ধরে দেশে দৈনিক শনাক্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ২৭ মার্চ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের (১৪ থেকে ২০ মার্চ) তুলনায় চলতি সপ্তাহ (২১ থেকে ২৭ মার্চ) পর্যন্ত করোনার দৈনিক নমুনা পরীক্ষা, শনাক্ত, সুস্থতা এবং মৃত্যুহার বেড়েছে।

গত সপ্তাহে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ৪৭০ জনের। চলতি সপ্তাহে ২৩ হাজার ১০০ জনের। শনাক্তের হার বেড়েছে ৮৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত সপ্তাহে সুস্থ হয়েছিল ১০ হাজার ৪০৮ জন। চলতি সপ্তাহে হয়েছে ১৩ হাজার ২০৪ জন।

সুস্থতার হার বেড়েছে ২৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত সপ্তাহে মারা গেছে ১৪১ জন। চলতি সপ্তাহে ২০১ জন। মৃত্যুহার বেড়েছে ৪২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মোট ২২৪টি ল্যাবে ২২ হাজার ১৩৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩০টি নমুনা।

এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৩৬টি। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে ১১ লাখ ৪ হাজার ৯৯৪টি।

২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ২১ জন পুরুষ আর নারী ১৪ জন। তাদের প্রত্যেকেই হাসপাতালে মারা গেছেন।

তাদের মধ্যে ২১ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি, পাঁচজনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরে মধ্যে, ছয়জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এবং তিনজনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ছিল।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে এসেছেন ২৯৫ জন এবং আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ৮৮ জন। এ পর্যন্ত আইসোলেশনে এসেছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৭৫৭ জন।

আইসোলেশন থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৯২ হাজার ৮৩২ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ১০ হাজার ৯২৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার ডেডিকেটেড কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ১৬ শয্যা, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ১০, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০, মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ১৯ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি আইসিইউ শয্যার একটিও ফাঁকা নেই।

শুধু শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের ১৬টির একটি, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ছয়টির মধ্যে একটি ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ১৫টির মধ্যে একটি শয্যা ফাঁকা রয়েছে।

অর্থাৎ, করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি হাসপাতালগুলোর ১০৮টি শয্যার মধ্যে রোগী আছে ১০৫ জন।

অপরদিকে অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৮৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি ১৪৫ জন, ফাঁকা ৪৩টি।

পুরো ঢাকায় অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় মোট আইসিইউ শয্যা ২৯৬টি। এর মধ্যে রোগী ভর্তি ২৫০ জন। শয্যা ফাঁকা ৪৬টি।

  •